চার কলেজে পাসের হার ২২.৮৮ শতাংশ, অকৃতকার্য ৬৯১ জন

স্বপ্ন ছিল অনেকের, প্রস্তুতিও ছিল। পরীক্ষার ফল নিয়ে প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। কিন্তু ফল প্রকাশের পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার চার কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ৮৯৬ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ২০৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৬৯১ জন। পাসের হার ২২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র একজন।
ফলাফলের এমন হতাশাজনক চিত্রের মধ্যে ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছেন সুপ্রিয়া তাম্মী মিথিলা। চার কলেজের ৮৯৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী তিনি। চারদিকে যখন হতাশার গল্প, তখন মিথিলার অর্জন যেন আশার একটুকরো আলো।
মিথিলা বদলগাছী উপজেলার পারিচা গ্রামের বাসিন্দা শামীম হোসেনের মেয়ে। তিনি বদলগাছী সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। তাঁর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিয়মিত পড়াশোনা, ক্লাসে উপস্থিতি, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং নিজের প্রতি অদম্য বিশ্বাস।
মিথিলার কাছে সাফল্যের কোনো শর্টকাট ছিল না। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করার চেষ্টা করেছেন। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়েছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন কাঙ্ক্ষিত ফলের জন্য।
মিথিলা বলেন, ‘আমার এই সাফল্য প্রথমেই বাবা-মাকে দিতে চাই। তাঁরা সব সময় আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এরপর আমার কলেজের রাষ্টবিজ্ঞানের শিক্ষিকা রওশন আরা খান সোমা ম্যাডাম ও আইসিটির শিক্ষক শহিদুল ইসলাম স্যারকে দিতে চাই। তিনি আমাকে সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আমি নিয়মিত ক্লাস করতাম এবং প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন প্রস্তুত করতাম। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে ম্যাডাম বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় প্রতিদিন নিজেকে প্রস্তুত করেছি।’
জিপিএ-৫ পাওয়াই মিথিলার শেষ লক্ষ্য নয়। তাঁর চোখ এখন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দিকে। সেই স্বপ্ন পূরণে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি
একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে শুধু তার নিজের পরিশ্রমই নয়, কখনো কখনো শিক্ষকের উৎসাহ ও সহযোগিতাও বড় ভূমিকা রাখে। মিথিলার ক্ষেত্রেও তেমনই দুজন মানুষ হলেন বদলগাছী সরকারি কলেজের শিক্ষক শিক্ষিকা রওশন আরা খান সোমা ও শহিদুল ইসলাম।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন তারা। নিজেদের জীবনের সংগ্রামের গল্পও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করেন তারা।
রওশন আরা খান সোমা বলেন, ‘শুধু মিথিলা নয়, অন্য শিক্ষার্থীদেরও একইভাবে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমিও গ্রাম থেকে অনেক সংগ্রাম করে আজকের জায়গায় এসেছি। আমার জীবনের গল্পগুলো তাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি। আমি খুবই আশাবাদী, মিথিলা তার স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, আজকাল ছেলে মেয়েরা ক্লাসে উপস্থিত হতে চায় না। তবে যে দু চারজন উপস্থিত হয় তাদের হাতে কলমে শেখানো সহ অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকি। যাতে সাফল্যের দিকে পৌছানো সহজ হয়। তেমনি একজন হলো মিথিলা। আমি আশাবাদী সে ভালো কিছু করবে।
মিথিলার সাফল্য আনন্দের হলেও বদলগাছী চার কলেজের সামগ্রিক ফলাফল উদ্বেগজনক। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বদলগাছী সরকারি কলেজ থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছেন। এ কলেজ থেকে ৪৬৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৬১ জন। পাসের হার ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। উপজেলার চার কলেজের একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও এই কলেজের।
অন্যদিকে বদলগাছী মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে ১২৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৩ জন। পাসের হার ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ। গোবরচাঁপাহাট ডিগ্রি কলেজ থেকে ১৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৭ জন। পাসের হার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ।
সবচেয়ে কম পাসের হার কোলা আদর্শ ডিগ্রি কলেজে। এ কলেজ থেকে ১৪৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৪ জন। পাসের হার ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ এ কলেজের ৯০ শতাংশের বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
সব মিলিয়ে চার কলেজে ৮৯৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০৫ জন পাস করেছেন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৬৯১ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র একজন। চার কলেজের সম্মিলিত পাসের হার ২২ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
ফলাফলের এই চিত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন এমন ফলাফল? বিশেষ করে তিনটি কলেজে পাসের হার ১২ শতাংশের নিচে নেমে আসার কারণ কী? শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষকসংকট, পাঠ্যক্রম শেষ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোথায় ঘাটতি ছিল—এসব বিষয় সামনে এসেছে।
শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে বিষয়টিকে দেখার সুযোগ নেই। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল নির্ভর করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ওপর। তাই এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
স্থানীয় অভিভাবক ইবনে তাহির মুহাম্মদ নয়ন সহ কয়েকজন বলেন, শিক্ষার্থীদের ক্লাশে ফেরানো সহ ভালো ফলাফলের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ তৈরী করতে শিক্ষকের কাজ করতে হবে। বাড়ীতে মোবাইল আসক্তি কমাতে অভিভাবকদের দায়িত্ব নিতে হবে।
বদলগাছী সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রফিকুল ইসলাম শেখ সহ আরও তিন অধ্যক্ষের সাথে কথা হলে হতশা নিয়ে তারা জানান,আমরা খুশি না এই ফলাফলে। আগের সরকারের পলেসি ছিলো শতভাগ পাশ। বর্তমান সরকারের পলেসি কোয়ালিটি। এই বিষয় মাথায় নিয়ে ক্লাসমুখী করতে আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছি।
একদিকে ৬৯১ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার হতাশা, অন্যদিকে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া মিথিলার সাফল্য। এই দুই বিপরীত চিত্র বদলগাছীর কলেজশিক্ষার বাস্তবতা নতুন করে সামনে এনেছে।





























