আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে দিলেন মেসি

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে। দীর্ঘ ২০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক আবেগঘন চিঠিতে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর থেকেই মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছিল। নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ওই ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা।

তবে ফাইনালের পরপরই অবসরের ঘোষণা দেননি মেসি। বরং ২১ জুলাই দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানিয়েছিলেন, ফাইনালের পরের যন্ত্রণা কাটতে সময় লাগবে এবং বিশ্বকাপে দলের অর্জন ও সমর্থকদের ভালোবাসাকে তিনি স্মরণীয় করে রাখতে চান। তখনও জাতীয় দল থেকে অবসরের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি তিনি।

এরপর আগস্টে বাবার মৃত্যু মেসির সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করে। মেসির বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসি ৮ আগস্ট ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর মেসি নিজের ফুটবল ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছিলেন।

এবার সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন তিনি।

মেসি তার চিঠির শুরুতেই লিখেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ভাবার পর তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্তটি তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের হলেও এটিই সঠিক সময় বলে মনে করছেন তিনি।

জাতীয় দলের হয়ে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। শুধু সাম্প্রতিক সময়ে শিরোপা জয়ের সময় নয়, তার আগেও প্রতিটি ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

মেসির ভাষায়, জাতীয় দলের হয়ে খেলা তার কাছে সবসময়ই ছিল ভালোবাসার বিষয়। তবে এখন মনে হচ্ছে, তার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। একই সঙ্গে তিনি আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জায়গা করে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।

সবচেয়ে আবেগঘন বার্তাটি এসেছে সমর্থকদের উদ্দেশে। দুই দশক ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সময় সমর্থকদের যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা তিনি কখনো ভুলবেন না বলে জানিয়েছেন।

এখন থেকে মাঠের ভেতর নয়, গ্যালারির বাইরে থেকে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন তিনি। অর্থাৎ, জাতীয় দলের জার্সিতে আর নয়—একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবেই প্রিয় দলকে অনুসরণ করবেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।

মেসি তার পরিবার, জাতীয় দলের সতীর্থ, কোচ ও কর্মকর্তাদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাদের সঙ্গে কাটানো সময়কে নিজের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

চিঠির শেষদিকে মেসি লিখেছেন, আর্জেন্টিনার হয়ে পাওয়া সব অর্জন ও স্মৃতি নিয়ে তিনি গর্বিত। সতীর্থদের সঙ্গে মিলে দেশকে কিছু ‘স্বপ্নের মুহূর্ত’ উপহার দিতে পেরেছেন- এটাই তার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।

এরপর ভালোবাসা ও আবেগে তিনি লিখেছেন- ঈশ্বর তাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞ। শেষ করেছেন, ‘গো আর্জেন্টিনা!’ বার্তা দিয়ে।

তবে মেসির প্রকাশিত চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো এর সময়কাল। তিনি জানিয়েছেন, চিঠিটি মূলত লিখেছিলেন ২১ জুলাই- বিশ্বকাপ ফাইনালের দুদিন পর। অর্থাৎ স্পেনের কাছে হারের পরই জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সেই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়েছে।

দুই দশকের অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের শেষ

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। দীর্ঘ দুই দশকে তিনি জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমা জয়ের পাশাপাশি অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন।

বিশ্বকাপ ২০২৬-এ ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। আসরে আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট নিয়ে দলের আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (এএফএ) উল্লেখ করেছে।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করার পর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও পূরণ হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে শিরোপা ধরে রাখার শেষ সুযোগটি স্পেনের কাছে হেরে শেষ হয়।

এবার সেই হারের কয়েক সপ্তাহ পরই জাতীয় দলকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানালেন তিনি। ফলে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাচ্ছে স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালটিই।

একটি যুগের শেষ- মেসি আর আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামবেন না। তবে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি, অর্জন ও অসংখ্য অবিস্মরণীয় মুহূর্ত আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবে।