কী হবে চট্টগ্রামের দুই আসনে? অপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ রায়ের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন দুজনই। কিন্তু নির্বাচনের সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেলেও সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেননি বিএনপির দুই নেতা—চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের সারোয়ার আলমগীর এবং চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড ও নগরের আংশিক) আসনের মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। দুজনের বিরুদ্ধেই ঋণখেলাপির অভিযোগ ঘিরে চলেছে আইনি লড়াই।

এর মধ্যে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। অন্যদিকে, সারোয়ার আলমগীরের বিষয়ে হাইকোর্টে শুনানি চলছে। ফলে দুই আসনের কয়েক লাখ ভোটার কার্যত সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন। আদালতের রায়ের পর কি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, নাকি নতুন করে নির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন। যদি পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ আসে, তবে সেখানে এ প্রার্থী অংশ নিতে পারবেন কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় এবং পরবর্তী নির্দেশনার ওপর।

চট্টগ্রাম-৪ আসনে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আনোয়ার সিদ্দিকী পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। তবে নির্বাচনের আগেই ঋণখেলাপির অভিযোগে তার প্রার্থিতা নিয়ে আইনি বিরোধ সৃষ্টি হয়। নির্বাচন কমিশন ও হাইকোর্ট প্রার্থিতা বহাল রাখলেও আপিল বিভাগ নির্বাচনের ফল স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ আপিল বিভাগ তার প্রার্থিতা বাতিল করায় তিনি আর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।

তবে এখানেই শেষ নয়। আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশে স্পষ্ট করে বলা হয়নি, এখন ওই আসনে নতুন নির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। ফলে নির্বাচন কমিশনও আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, আদালত যে নির্দেশ দেবেন, কমিশন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। আদালত যদি নতুন নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেন, তাহলে নতুন তপশিল ঘোষণা হবে। আর যদি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ আসে, তবে কমিশন সে পথেই এগোবে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ এলে সেটি উপনির্বাচন হবে না; বরং নতুন তপশিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেক্ষেত্রে আইনি যোগ্যতা অর্জন করতে পারলে আসলাম চৌধুরীও অন্যদের মতো অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসলাম চৌধুরী জানান, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব, আপিলের রায় আমাদের পক্ষে আসবে। আমি যখন মনোনয়নপত্র দাখিল করি, তখন রিটার্নিং অফিসার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন। মামলার বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিট করলেও আদালত তা খারিজ করে দেন।

এরপর সুপ্রিম কোর্টে তারা আপিল করেছে এবং সুপ্রিম কোর্ট আমাকে নির্বাচন করতে দিয়েছে, জনগণও আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে।’

তিনি বলেন, ‘ঋণখেলাপির যে সংজ্ঞা ছিল, সে সংজ্ঞা অনুসারে আমরা প্রতিটি পর্যায়ে বৈধ হয়েছি। এখন যদি আদালত নতুন কোনো সংজ্ঞা দেয়, সে বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। তবে, আপিল বিভাগের রায়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি।’

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের পরিস্থিতিও অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর নির্বাচনে জয়ী হলেও তার বিরুদ্ধেও ঋণখেলাপির অভিযোগে মামলা হয়। আপিল বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার নির্বাচনের ফল, গেজেট প্রকাশ এবং শপথ স্থগিত রয়েছে। এরই মধ্যে হাইকোর্টে রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবাই।

ফলে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন শুরু করলেও চট্টগ্রামের এ দুটি আসন এখনো কার্যত প্রতিনিধিশূন্য। স্থানীয় উন্নয়ন, সংসদে জনস্বার্থের বিষয় উত্থাপন এবং সাংবিধানিক প্রতিনিধিত্ব—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রায়ের পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলও বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে এর আইনি পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। একই মত নির্বাচন কমিশনেরও। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের ভাষা বিশ্লেষণ করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে আদালতের রায়ের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে—এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইন কী বলে। নির্বাচন কমিশন ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি সরল নয়। কারণ, নির্বাচনি আইনে প্রার্থিতা বাতিলের সময়, আদালতের নির্দেশনা এবং ভোটগ্রহণ-পরবর্তী পরিস্থিতি—প্রতিটি ক্ষেত্রের আইনি ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। তাই চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে দুটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রথমত, আদালত যদি মনে করেন নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী আইনগতভাবে অযোগ্য ছিলেন এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা যায়, তাহলে নির্বাচন কমিশন সেই অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী সংসদ সদস্য হিসেবে ঘোষণা পেতে পারেন। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, আদালত যদি মনে করেন নির্বাচনি প্রক্রিয়াই আইনি ত্রুটিতে আক্রান্ত হয়েছে, তাহলে পুরো নির্বাচন বাতিল করে নতুন তপশিলের মাধ্যমে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারেন। নির্বাচন কমিশনও ইঙ্গিত দিয়েছে, এমন নির্দেশ এলে এটি উপনির্বাচন হিসেবে নয়, বরং নতুন নির্বাচন হিসেবেই অনুষ্ঠিত হবে। তখন আইনি যোগ্যতা অর্জন করতে পারলে আগের প্রার্থীসহ অন্যরাও আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন। তবে নির্বাচন কমিশন কিংবা রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার কেউই আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে কোনো সম্ভাবনাকেই নিশ্চিত বলতে রাজি নন। তাদের ভাষ্য, সংক্ষিপ্ত আদেশে চূড়ান্ত করণীয় স্পষ্ট নয়; পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণই কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। চট্টগ্রাম-২ আসনের পরিস্থিতিও প্রায় একই ধরনের অনিশ্চয়তায় আটকে রয়েছে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর বিজয়ী হলেও ঋণখেলাপির অভিযোগে তার প্রার্থিতা নিয়ে আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আপিল বিভাগের নির্দেশে হাইকোর্টে জারি করা রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ফল, গেজেট প্রকাশ এবং শপথ স্থগিত রয়েছে। সম্প্রতি হাইকোর্টে রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়েছে। এখন আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারবেন কি না। ফলে নির্বাচনের কয়েক মাস পরও চট্টগ্রামের দুটি সংসদীয় আসনের ভোটাররা কার্যত প্রতিনিধিহীন অবস্থায় রয়েছেন। স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি সিদ্ধান্তে সংসদীয় তদারকি, জনগণের দাবি-দাওয়া জাতীয় সংসদে উপস্থাপন—সব ক্ষেত্রেই এ শূন্যতা অনুভূত হচ্ছে। যদিও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে, তবু জনগণের সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধির অনুপস্থিতি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই আসনের ভবিষ্যৎ শুধু চট্টগ্রামের রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে। চট্টগ্রাম-৪ আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী জামায়াতের হওয়ায় আদালতের নির্দেশনা রাজনৈতিক সমীকরণেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। আবার পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এলে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দল নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামবে। ফলে আদালতের রায় শুধু দুই প্রার্থীর ভাগ্য নয়, দুই আসনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করবে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের দুটি সংসদীয় আসন এখন দেশের নির্বাচনি ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে আদালতের ব্যাখ্যায় ঋণখেলাপির সংজ্ঞা ও প্রার্থিতার বৈধতার প্রশ্ন, অন্যদিকে কয়েক লাখ ভোটারের প্রতিনিধিত্বের অধিকার—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে এসেছে। এখন নজর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় এবং হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের দিকে। সেই সিদ্ধান্তই বলে দেবে—দুই আসনে নতুন করে ভোট হবে, নাকি অন্য কোনো সাংবিধানিক ও আইনি পথেই শেষ হবে দীর্ঘদিনের এ অনিশ্চয়তা।

কালবেলা