লাখো ভক্তের পদচারণায় গোদাগাড়ীতে শুরু হলো ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব মহোৎসব

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর ঐতিহাসিক খেতুরীধামে লাখো ভক্তের পদচারণায় শুরু হয়েছে সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব (খেতুরিভাব) মহোৎসব। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার সন্ন্যাসী ও ভক্তদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠেছে পদ্মাপাড়ের খেতুরীধাম।
উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন পর্যপ্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যসহ বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রীতি অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলা কার্তিক মাসের প্রথম তিন দিন নাম-প্রার্থনা ও নানা ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এই মহোৎসব উদযাপিত হয়। উৎসবের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর/১১ কার্তিক) বিকেল ৪টা থেকে নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয় রচিত ভজন কীর্তন, সন্ধ্যা আরতি, দামোদর আরতি, নরোত্তম চরিতকথা এবং অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা ঘটে।
আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর/১২ কার্তিক) উৎসবের দ্বিতীয় দিনে ভোর থেকে মঙ্গল আরতি, হরিনাম সংকীর্তন সংযোগে খেতুরীধাম পরিক্রমা, দর্শন আরতি ও শ্রীল প্রভুপাদ গুরুপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অষ্টপ্রহর কীর্তন, প্রসাদ গ্রহণ ও ধর্মীয় আচারে মেতে আছেন ভক্তরা। আগামীকাল ৩ কার্তিক ভক্তদের গঙ্গাস্নানের পর দীর্ঘ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনব্যাপী এই তিরোভাব মহোৎসব।
মহোৎসবকে কেন্দ্র করে খেতুরীধামে বসেছে ঐতিহ্যবাহী বিশাল মেলা। মেলায় ধর্মীয় উপকরণের পাশাপাশি মিলছে সৌখিন ও বাহারি খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী, কারু-চারু পণ্য এবং কামার-কুমারের তৈরি মৃৎ ও লৌহজাত দ্রব্য। আয়োজকরা জানান, খেতুরীর এই মেলা মূলত সন্ন্যাসীদের মিলনমেলা হলেও অহিংসা ও মানবপ্রেমে বিশ্বাসী সব ধর্মের মানুষ এতে সমানভাবে অংশ নেন।
খেতুরীধাম ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, “শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও সম্প্রীতির টানে এখানে আসেন। এবারও ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতায় সুষ্ঠুভাবে উৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।”
উৎসবের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুজন মিয়া জানান, মহোৎসবে আগত দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিচ্ছিদ্র ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উৎসব প্রাঙ্গণ ও এর আশেপাশে পর্যপ্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ভক্তরা যেন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারেন, সেদিকে পুলিশের কড়া নজরদারি রয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান জানান, ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবটি যেন যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন হয়, সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা প্রদান করছে।
উল্লেখ্য, অহিংসা ও মানবপ্রেমের মহান সাধক নরোত্তম দাস ঠাকুর ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী পদ্মাতীরের গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন তৎকালীন জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার। ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান হয়েও নরোত্তম দাস বিলাসবহুল জীবন পরিহার করে ছোটবেলা থেকেই ধর্মপরায়ণ ও সংসারবিমুখ ছিলেন।
সমাজে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবসেবার মাধ্যমে তিনি সনাতন বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।
জীবদ্দশায় তিনি নিজ গ্রাম গোপালপুরের পাশে খেতুরিতে আশ্রম নির্মাণ করে ধর্মসাধনায় নিয়োজিত হন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে তাঁর খ্যাতি ও সাধনার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁর অন্যতম বড় অবদান হলো বৈষ্ণব সমাজে ‘পদাবলি কীর্তন’ বা ‘লীলা রসকীর্তন’-এর প্রবর্তন।
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের পদাবলি ধারায় নরোত্তম দাস ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম আজও এক অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে এই খেতুরধামেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।



























