আজিজ খলিফা হত্যা মামলার মূলহোতা উদয়ন ধর গ্রেফতার

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের আলোচিত ব্যবসায়ী আজিজ খলিফা (৫৩) অপহরণ ও হত্যা মামলার প্রধান এজাহারভুক্ত আসামি এবং মূল পরিকল্পনাকারী উদয়ন ধর (৪০)-কে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করা হয়।

র‍্যাব সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুন ২০২৬ রাত ১০টা ১০ মিনিটে র‍্যাব-১৫, কক্সবাজার এবং র‍্যাব-৭, চট্টগ্রাম (সিপিসি-৩)-এর একটি চৌকস আভিযানিক দল যৌথভাবে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তাকে আটক করতে সক্ষম হয়।

মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ২০ মে দুপুরে ব্যবসায়ী আজিজ খলিফা তার পাওনা ৬ লাখ টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে নাইক্ষ্যংছড়ির উত্তর বাইশারী বাজারে অবস্থিত উদয়ন ধরের কাপড়ের দোকানে যান। অভিযোগ রয়েছে, টাকা পরিশোধ না করে উদয়ন ধর কৌশলে ভিকটিমকে এক হাজার টাকা পথখরচ দিয়ে কক্সবাজারের সিআইসি হাসপাতালে তার পরিচিত এক চিকিৎসকের কাছে পাঠান।

ভিকটিম হাসপাতালে পৌঁছানোর পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওৎ পেতে থাকা ৩ থেকে ৪ জন দুর্বৃত্ত তাকে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে অবরুদ্ধ করে খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার উদ্দেশ্যে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়।

চরম নির্যাতনের মধ্যেও আজিজ খলিফা কৌশলে নিজের ইমো অ্যাকাউন্ট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩৬ মিনিটে মামলার এক সাক্ষীর মোবাইল নম্বরে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠাতে সক্ষম হন। পরে একই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে কক্সবাজারের ঈদগাহ থানাধীন কালিরছড়া রেললাইনের পাশ থেকে স্থানীয় লোকজন তাকে হাত-পা বাঁধা ও রক্তাক্ত মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে।

প্রথমে তাকে ঈদগাহ মডেল হাসপাতাল এবং পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি ঘটায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় পরদিন ২১ মে তাকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তবে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে অক্ষম হয়ে ২২ মে পরিবার তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ মে সকালে নিজ বাড়িতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর খবর পেয়ে বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত পক্ষ স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার চেষ্টা চালায় এবং মামলার বাদী ও পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জনগণের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ফলে ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় র‍্যাব-১৫ ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং দেশব্যাপী গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ মে ভিকটিমের দ্বিতীয় স্ত্রী সেলিনা আক্তার বেবী নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি নাইক্ষ্যংছড়ি থানার মামলা নং-০৮, তারিখ ২৫ মে ২০২৬ হিসেবে রুজু হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩৪২, ৩২৩, ৩২৬, ৩০২, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

মামলা দায়েরের পর থেকেই প্রধান আসামি উদয়ন ধর আত্মগোপনে চলে যায়। পরবর্তীতে র‍্যাবের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দুর্গম জঙ্গলে অবস্থান করছেন। তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত উদয়ন ধর বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ২ নম্বর বাইশারী ইউনিয়নের উত্তর বাইশারী ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাংগাইশিয়া এলাকার মৃত বজেন্দ্র ধরের ছেলে।

র‍্যাব জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্রেফতারকৃত আসামিকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।