গাজাবাসীদের পক্ষে লড়াই করা শান্তিতে নোবেলজয়ী কে এই নাভি পিল্লাই

গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এবার আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের পক্ষে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। শুক্রবার (০৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নোবেল কমিটি তার নাম ঘোষণা করে।

৮৫ বছর বয়সী পিল্লাই জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে তিনি গত বছর এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায়ে ইসরায়েল চার ধরনের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ওই প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় পিল্লাই বলেছিলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ইসরায়েল এসব কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। তার অভিযোগ, ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীও গণহত্যায় উসকানি দিয়েছেন।

যদিও গাজায় গণহত্যার বিষয়ে পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিশনের প্রতিবেদন ও অভিযোগের ভিত্তিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এমন কথা কমিটি বলেনি। নোবেল কমিটি তার দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের পক্ষে ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে।

বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে

দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পিল্লাই ১৯৬৭ সালে তৎকালীন নাটাল প্রদেশে আইন পেশা শুরু করেন। ওই অঞ্চলে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করা প্রথম নারী ছিলেন তিনি। বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এবং অন্য আন্দোলনকর্মীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তী সময়ে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই।

নোবেল কমিটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালে তার ভূমিকা ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অংশ হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন।

‘আন্তর্জাতিক আইন এখন অপরিহার্য’

নোবেল কমিটি বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পক্ষে কাজ করেছেন পিল্লাই। বিশ্ব যখন দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ ও সংঘাতের মুখোমুখি, তখন শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইন আর অতিরিক্ত কোনো বিষয় নয়, বরং অপরিহার্য।

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবস্থা ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলোও আক্রমণের শিকার। তার মতে, বিশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলার মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখা রক্ষা করেন বিচারকেরা।

পুরস্কার ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় পিল্লাই বলেন, প্রথমে তার মনে হয়েছিল খবরটি হয়তো নিছক মজা। আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে তিনি খবরটি যাচাই করতে চেয়েছিলেন বলেও জানান।

গাজা নিয়ে তার প্রতিবেদন প্রসঙ্গে পিল্লাই বলেন, সম্প্রতি তিনি সেখানে যা ঘটছে, তাকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনের পর তার সাহসের প্রশংসা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সত্য বলার জন্য সাহসের প্রয়োজন হবে কেন?

পুরস্কারের অর্থ ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা

এ বছরের শান্তি পুরস্কারের জন্য নোবেল কমিটি ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মনোনয়ন পেয়েছিল। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, সুদানের জরুরি সহায়তাকর্মীরা, ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দীর্ঘদিন ধরে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। পুরস্কার ঘোষণার পর পিল্লাই মজা করে বলেন, দর্শকেরা আরও বেশি হাততালি দিলে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে পুরস্কার ভাগ করে নিতে পারেন।

পুরস্কার হিসেবে পিল্লাই পাবেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। আগামী ১০ ডিসেম্বর অসলোতে সুইডিশ শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

সূত্র : আল জাজিরা