গ্যাস সংকটে কলেজের হোস্টেলে একবেলা না খেয়ে থাকছেন শিক্ষার্থীরা, দুইবেলা চলছে সিলিন্ডার গ্যাসে

শেরপুরে গত চার দিন ধরে সরকারি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শেরপুর সরকারি কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। গ্যাস সংকটে কলেজের ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেলে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা রান্না হচ্ছে। ফলে সকালে রান্না না হওয়ায় একবেলা না খেয়েই ক্লাস ও পড়াশোনা করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
সংকট মোকাবিলায় হোস্টেল দুটিতে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হলেও এতে রান্নার খরচ বেড়ে গেছে।
শেরপুর সরকারি কলেজে রয়েছে ১০৮ শয্যার ছাত্র হোস্টেল ‘শহিদ মাহবুব হল’ এবং ১৩০ শয্যার ছাত্রীনিবাস। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ জেলার বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এসব হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছেন। তুলনামূলক কম খরচে থাকা ও পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার জন্য অনেক শিক্ষার্থী হোস্টেলে থাকলেও গ্যাস সংকটে এখন তাদের বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে।
হোস্টেল সূত্রে জানা গেছে, সরকারি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রান্না চালু রাখতে দুই হোস্টেলেই এলপিজি সিলিন্ডার কিনে দেওয়া হচ্ছে। তবে তিন বেলা রান্না করলে দ্রুত সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যায়। এতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় আপাতত দুপুর ও রাতে দুই বেলা রান্না করা হচ্ছে। সকালে রান্না বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা একবেলা খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শহিদ মাহবুব হলের শিক্ষার্থী ফুলু আহমেদ বলেন, “সকালে রান্না না হওয়ায় অনেক সময় না খেয়েই ক্লাসে যেতে হচ্ছে। আমরা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসে এখানে পড়াশোনা করছি। কম খরচে থাকার জন্য হোস্টেলে উঠেছি। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এখন খাবারের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।”
ছাত্রীনিবাসের শিক্ষার্থী শান্তি আক্তার বলেন, “সকালে খাবার না থাকায় আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। না খেয়ে ক্লাস ও পড়াশোনা করা কঠিন। তিন বেলা রান্না করলে সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায় বলে দুই বেলা রান্না করা হচ্ছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত গ্যাসের সমস্যা সমাধান করা হোক।”
ছাত্রীনিবাসের সহকারী হোস্টেল সুপার প্রভাষক শাহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, “শেরপুরে গ্যাস লাইন বন্ধ থাকায় ছাত্রীনিবাসে সিলিন্ডার গ্যাস কিনে দেওয়া হচ্ছে। খরচ কমাতে দুই বেলা রান্না হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, গ্যাসের সমস্যা দ্রুত সমাধান হোক।”
শহিদ মাহবুব হলের সুপার সহকারী অধ্যাপক আবুল বাশার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, “সরকারি বিভিন্ন দপ্তর—হাসপাতাল, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস থাকা জরুরি। খরচ কমাতে মফস্বল থেকে শিক্ষার্থীরা শহরে এসে হোস্টেলে থাকছেন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে তাদের খরচই এখন বাড়ছে।
গত চার দিন ধরে সরকারি গ্যাস লাইনে গ্যাস নেই। সিলিন্ডার গ্যাস কিনে দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ খরচে। তিন বেলা রান্না করলে দ্রুত সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যায়। তাই দুপুর ও রাতে দুই বেলা রান্না হচ্ছে, এক বেলা রান্না বন্ধ রয়েছে।”
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিতাস গ্যাসের শেরপুর জেলার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. বদরুজ্জামান। তিনি বলেন, “গত ১২ আগস্ট বুধবার রাত ১০টা থেকে শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মাতারবাড়ী ও মহেশখালী অঞ্চলের এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগতে পারে।”
তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরে প্রায় ৪ হাজার আবাসিক গ্রাহক ও ২২টি বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জেলায় একটি সিএনজি চালিত পাম্প রয়েছে। জেলার মাসিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২৭ থেকে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের চাপ থাকে ২০ থেকে ২২ পিএসআই। শেরপুরে গ্যাসের সরবরাহ মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মাতারবাড়ী অঞ্চল থেকে হয়ে থাকে।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশার চালকরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না থাকায় অনেক চালক গাড়িতে জ্বালানি নিতে পারছেন না। ফলে অটোরিকশা চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এতে যাত্রীদেরও বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটেও ভোগান্তি বাড়ছে। শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। রান্নার কাজে গ্রামের অনেক পরিবার লাকড়ি ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় গ্যাস সংকটের প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও বিদ্যুৎ সংকট তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
শেরপুর সরকারি কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত সরকারি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সংকটকালীন সময়ে হোস্টেলগুলোতে পর্যাপ্ত বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি কাটিয়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে স্বাভাবিক হতে আরও পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগতে পারে। ফলে সংকট অব্যাহত থাকলে হোস্টেলসহ শেরপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।





















