টুরিজম স্পর্ট সাজেকে কাল শনিবার থেকে আবার অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ঘোষণা

পার্বত্য জেলার টুরিজম স্পর্ট সাজেকে গুলাগুলির ঘটনার পর রাঙামাটির সাজেকে সড়ক অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ কাল(শনিবার-২৪শে অক্টোবর) থেকে আবার চতুর্থ দফায় অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ঘোষণা, পর্যটকদের চলে আসার অনুরোধ করেছে।
গত বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ শুরু হলে পিকেটার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সঘর্ষের জাড়িয়ে পড়ে। তাই শুক্রবারের মধ্যে সাজেক থেকে সব পর্যটককে চলে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।
এতে শনিবার(২৪শে অক্টোবর) রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি ২টি জেলায় অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।
বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর) বিকেলে সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাজেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে এ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান।
বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা জানান, শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই জেলায় সড়ক ও নৌপথে অবরোধ চলবে। কর্মসূচি সফল করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
তবে অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি।
এর আগে রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয় দফায় অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। গত শুক্রবার বিকেলে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা ও সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটির আহŸায়ক বাবুধন চাকমার সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এর আগে বাঘাইহাট ও মাচলং বাজার দুর্গাপূজা উদ্যাপন কমিটির অনুরোধে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত শুক্রবার থেকে বুধবার পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ায় পূজা শেষে বৃহষ্পতিবার থেকে আবারও রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আজকের মধ্যেই পর্যটকদের সাজেক ত্যাগ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। বৃহষ্পতিবার (২২শে অক্টোবর) নিরাপত্তাবাহিনী লাঠি চার্জ, হামলা, গুলিবর্ষনের নাটকের প্রতিবাদে পুন:রায় সড়ক অবরোধ ঘোষনা দেয়।
এর আগে ১৫ই অক্টোবর সকাল ছয়টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে দ্বিতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেন সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। বাঘাইহাটের ১০নম্বর এলাকা, গঙ্গারাম সেতু ও মাচলঙের ১৪কিলোসহ কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধ করা হয়। এতে সাজেকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস–-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। ১১ই অক্টোবর একই দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরা। সেদিন বিকেলে প্রশাসনের আশ্বাসে ৪৮ঘণ্টার জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এরপর গতকাল বুধবার যৌথ বিবৃতিতে দ্বিতীয় দফায় অবরোধের ঘোষণা দেন দুই সংগঠনের নেতারা।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, সাজেক এলাকায় পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিসিজেএসএস)। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ইউপিডিএফের চাপে সংগঠন দুটি অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অবরোধের কারণে গত রোববার পর্যটকবাহী যানবাহন সাজেকে আটকা পড়েছিল। ওই দিন সন্ধ্যায় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণায় ১৫ই অক্টোবর এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
গত বৃহষ্পতিবার(২২শে অক্টোবর) অবরোধকারীদের ওপর হামলার পর সেনাবাহিনীর ‘গোলাগুলির’ নাটক, জনমনে আতঙ্ক, সাজেকের উজোবাজারে এক নারীর ওপর সেনাবাহিনীর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ। তবে আইএসপিআর জানিয়েছে, সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। পুলিশ বলছে, সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় সেনা-পুলিশসহ অন্তত: ৬জন আহত হয়েছে।
রাঙামাটির সাজেকের উজোবাজার এলাকায় সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালনকারী জনতার ওপর হামলা, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণের পর সেনাবাহিনী কথিত ‘গোলাগুলির’ নাটক সাজিয়ে জনগণকে ভীতি সন্ত্রস্ত করে রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ঘটনার বিবরনে জানা যায়, তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় বৃহস্পতিবার (২২শে অক্টোবর ২০২৬) সকাল থেকে তৃতীয় দফা সড়ক অবরোধ পালন করছিল উক্ত দ্ংুগঠনের নেতা-কর্মীসহ এলাকার সাধারণ জনগণ। তারা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে থাকে। পরে তারা উজোবাজারে গিয়ে সড়কের ওপর বসে পড়ে এবং সাজেক পর্যটন সড়কটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সাজেক ভ্যালী পর্যটনে আটকে পড়া পর্যটকদের গাড়ি বহর নিয়ে উজোবাজারে উপস্থিত হয়। অবরোধকারীরা সড়কটি ছেড়ে না দিলে এক পর্যায়ে সকাল ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারী জনতার ওপর হামলা, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং পর্যটকদের গাড়ি বহর খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
সেনাবাহিনীর এই বর্বরোচিত হামলায় ৪০জনের অধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন।
এ হামলার পরপরই সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে সেখানে ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে কথিত গোলাগুলি’র নাটক মঞ্চস্থ করে। তারা উজোবাজারসহ আশে-পাশের বিভিন্ন স্থান থেকে থেমে থেমে গুলিবর্ষণ করে জনমনে ভীতি সঞ্চার করে। এমনকি ভয়ে পালাতে থাকা লোকজনের দিকে লক্ষ্য করেও গুলিবর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেখানে সেনাবাহিনীর সাথে কারোর গোলাগুলি হয়নি, সেনাবাহিনী নিজেরাই একতরফাভাবে গুলিবর্ষণ করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইউপিডিএফ এক বিবৃতিতে সাজেকে ‘গোলাগুলির’ ঘটনাকে সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছে। বিবৃতিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেছেন, “মূলত পিসিজেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে।”
অপর এক বিবৃতিতে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ সাজেকে শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা বিবৃতিতে বলেছেন, “সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবি এলাকা থেকে পিসিজেএসএস সন্তু লারমা গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে না নিয়ে, তাদের অত্যাচার ও সশস্ত্র সন্ত্রাস বন্ধ না করে, উল্টো নিরীহ সাজেকবাসীর উপর বিনা উস্কানিতে হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এই হামলা সন্ত্রাসীদের রক্ষার জন্যই করা হয়েছে।”
এদিকে, সেনাবাহিনীর হামলা ও গুলিবর্ষণের কারণে বর্তমানে উজোবাজারসহ আশে-পাশের এলাকায় আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকার লোকজন ভয়ে দোকানপাট ও ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হযেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
তাদের তিন দফা দাবি বা শর্ত ছিল- ১. ৪৮ঘন্টা সময়ের মধ্যে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে, ২. পিসিজেএসএসের সদস্যরা কাউকে মৃত্যুর হুমকি দেবে না ও ৩. সেনা প্রশাসন কর্তৃক সাধারণ নিরীহ জনগণের ঘর-বাড়ি তল্লাশি ও হয়রানি করা যাবে না।
কিন্তু প্রশাসন দাবি বা শর্ত পূরণ না করায় গতকাল (বুধবার) সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি আহŸায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এক যৌথ বিবৃতিতে বৃহস্পতিবার থেকে পুনরায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
অপরদিকে রাঙামাটির সাজেকের উজোবাজারে এক নারীর ওপর সেনাবাহিনীর সদস্যরা অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর ২০২৬) বিকাল ৫টার সময় এ অমানবিক ঘটনাটি ঘটে। নির্যাতনের শিকার নারীর নাম সমাপ্তি চাকমা(৩০), স্বামী: চিবাবু চাকমা, গ্রাম: উলুছড়া, সাজেক, রাঙামাটি।
ঘটনা বিবরনে জানা যায়, ভুক্তভোগী সমাপ্তি চাকমা তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী অসুস্থতার কারণে দেখভাল করার জন্য খাগড়াছড়িতে যান। বৃহষ্পতিবার বিকেল ৫টার সময় তিনি খাগড়াছড়ি থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি উজোবাজারে পৌঁছলে সেখানে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করে। এতে তিনি শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের ডাকে অবরোধ পালনকালে বুহষ্পতিবার সকাল ১১টার সময় সেনাবাহিনী অবরোধকারী জনতার ওপর হামলা, বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে ৪০জনের অধিক নারী-পুরুষ আহত হন। এ ঘটনার জের ধরে সেনারা সমাপ্তি চাকমাকে নির্যাতন করেছে বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন।
অপরদিকে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইউপিডিএফের গুলিবর্ষণ হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তিন হাজার পর্যটক উদ্ধার। তবে ইউপিডিএফ সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সেনাবাহিনীর গোলাগুলির খবর সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছে। পার্বত্য রাঙামাটির সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ)।
এ ঘটনায় সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাজেকে ভ্রমণরত অবস্থায় আটকা পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২২শে অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে ২০৩ব্রিগেড’র বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। পর্যটকবাহী যান চলাচলের সময় সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
এতে পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। তবে সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫মিনিটের দিকে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। পরে পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে প্রাথমিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যের বরাতে বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং তাঁদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।
আইএসপিআরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা, পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক অবরোধে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স¤প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানায় আইএসপিআর।
অন্যদিকে রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপারের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রথম আলো-সহ কতিপয় সংবাদ মাধ্যমে বাঘাইছড়ির সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে বৃহষ্পতিবার দুপুরে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি চলেছে বলে যে খবর প্রচার করা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট আখ্যায়িত করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)।
বৃহস্পতিবার (২২শে অক্টোবর ২০২৬ এক বিবৃতিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, বৃহস্পতিবার কোন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার জনগণের সাথে কথা বলে এমন খবরের সত্যতার বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি।
মূলত পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অংগ্য মারমা শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের উপর বর্বর হামলা, লাঠিচার্জ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও নিন্দা জানান। তিনি অবিলম্বে সাজেকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে উক্ত এলাকা থেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সরিয়ে নেওয়ার ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’র প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
পুলিশের বক্তব্য, সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় অবরোধকারীদের হামলায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের অন্তত ছয় সদস্য আহত হয়েছেন। সাজেক থেকে পর্যটকদের গাড়িবহর ছেড়ে যাচ্ছে এমন সময় সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় সেনা-পুলিশসহ ৬জন আহত হয়েছে। রাঙামাটির সাজেক সড়কের উজোবাজারে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
পর্যটকবাহী যানবাহন পার করে দেওয়ার জন্য সড়কের ব্যারিকেড সরানোর আহŸান জানালে অবরোধকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে প্রথমে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে অবরোধকারীরা গুলিবর্ষণ শুরু করলে আত্মরক্ষার্থে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। এতে দুপুর একটা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা উভয় পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে ব্যাপক গুলিবিনিময় চলে।
বুহষ্পতিবার দুপুরে রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, অবরোধকারীদের হামলায় সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য জখম হয়েছেন। প্রায় দুই ঘণ্টার এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির পর নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হলেও সাজেকে অবস্থানরত সব পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে দিঘীনালার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এই সশস্ত্র হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ১১ই অক্টোবর অবরোধ পালনকালে বিকেলে স্থানীয় সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন দুই সংগঠন ও সাজেকবাসীর উত্থাপিত তিন দফা দাবি বা শর্ত মেনে নিলে ৪৮ঘন্টার জন্য সড়ক অবরোধ স্থগিত করা হয়। এরপর শর্ত পূরণ না হওয়ায় ১৫ই অক্টোবর আবার তারা অবরোধ পালন করে। পরে শারদীয় দুর্গোৎসবের কারণে ১৬থেকে ২১শে অক্টেবর অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
প্রসঙ্গত, সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) ‘সশস্ত্র সদস্যদের’ সরিয়ে নেয়াসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে আবারও তৃতীয় দফায় রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ডাকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন নামে স্থানীয় দুটি সংগঠন।
তবে সংগঠন দুটি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ ঘনিষ্ঠ। সাজেকে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগটি বরাবরই অসত্য বলে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিসিজেএসএস)। এ নিয়ে চার দফায় অবরোধ কর্মসূচির জেরে এখন থমথমে সাজেক উপত্যকা।































