নেত্রকোনার মদনের হাওরে”চায়না দুয়ারী জাল” হুমকিতে দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য

নেত্রকোনা প্রতিনিধিঃ দেশের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনা হাওরাঞ্চল। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে ব্যবহার বেড়েছে নিষিদ্ধ রিং জালের, যা স্থানীয়ভাবে ‘চায়না দুয়ারী জাল’ নামে পরিচিত। উপজেলার বিভিন্ন হাওরে প্রকাশ্যেই চলছে এই অবৈধ জালের ব্যবহার। ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ, মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া এবং হাওরের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মদন উপজেলার ফতেপুর গুচ্ছ গ্রামের সামনে তলার হাওর বেড়িবাঁধ তিয়শ্রী বাঘমারা সামনে হাওর, মাঘান হাওর গোবিন্দশ্রী হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এই নিষিদ্ধ জাল।
স্থানীয়রা আক্ষেব করে বলেন, আমাদের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নেত্রকোনা-৪ আসনের এমপি লুৎফুজ্জামান বাবর হাওরে মাছের উৎপাদ বৃদ্ধি লক্ষে প্রায় কয়েক টন মাছের পোনা অবমুক্ত করেছেন বিভিন্ন হাওরে,যা ৪-৫ মাস রক্ষনা বেক্ষণ করার জন্য গ্রামে গ্রামে মৎস্য সুরক্ষা কমিটি গঠন করে দিয়েছে। এতো কিছু করার পরেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এক শ্রেণির অসাধু মৎস্য শিকারি নির্বিচারে মাছ শিকার চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রিং জালের ব্যবহার বাড়ার কারণে প্রতিবছরই হাওরে মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর ফলে মাছের উৎপাদনও কমছে। বাজারে মাছের সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় সাধারণ মানুষকে বেশি দামে মাছ কিনতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় হাওরে প্রচুর পরিমাণে বোয়াল, আইড়, চিতল, রুই, কাতলা, মৃগেল, বাউশ, শোল, শিং, মাগুর, কৈ, পাবদা, টেংরা, পুঁটি ও মলা মাছ পাওয়া গেলেও এখন আগের মতো এসব মাছ আর দেখা যায় না। অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছ দিন দিন বিরল হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের মতে, রিং জাল অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি মাছ ধরার উপকরণ। এ জালে একবার মাছ প্রবেশ করলে বের হওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে বড় মাছের পাশাপাশি মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ এবং বিভিন্ন প্রজাতির ছোট জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং হাওরের মৎস্যসম্পদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
উপজেলা বিএনপি সভাপতি নুরুল আলম তালুকদার বলেন,দেশিয় মাছ বৃদ্ধি জন্য মাননীয় এমপি মহোদয় বিভিন্ন হাওরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেছেন, এটা দেখভাল করার জন্য আমরা গ্রামে গ্রামে মৎস্য সু-রক্ষা কমিটি গঠন করে দিয়েছি। আমাদের লক্ষ রাখতে হবে যে, “চায়না দুয়ারী জাল’ ব্যবহার শুধু মাছের জন্যই নয়, পুরো হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
এ জালে মাছের পোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া, ব্যাঙ, সাপসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে মারা যায়। ফলে হাওরের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা যেমন কমে যাবে, তেমনি হাওরের অন্যান্য জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও সংকটের মুখে পড়বে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিষিদ্ধ এ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।
উপজেলা সহকারি মৎস্য কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হচ্ছে। তবে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এবং জনবল সংকটের কারণে সব এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।






















