বদলগাছীতে রোগী নেই, সেবা নেই, তবুও সমাজসেবা অফিসে চলে রোগী কল্যাণ কমিটির বরাদ্দ খরচ

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের রোগী কল্যাণ কমিটির বরাদ্দ ও কমিটি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় দরিদ্র রোগীদের জন্য প্রতিবছর সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও রোগীরা সে সুবিধা পাচ্ছেন না। বরাদ্দ ব্যয় দেখানো হলেও এলাকাবাসী বলছেন তারা কোনো চিকিৎসা সহায়তা, ঔষধ বা দাফন–ব্যয়ের সহায়তা পাননি।
সমাজসেবা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে বদলগাছী সমাজসেবা অফিস রোগী কল্যাণ কমিটি নামে ২৩ সদস্যের কমিটি গঠন করে। সদস্য ও সমাজের বিত্তশালী মানুষের চাঁদার পাশাপাশি প্রতিবছর ১ লক্ষ টাকা সরকারি বরাদ্দ আসে। উদ্দেশ্য হলো দুঃস্থ রোগীদের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বহন, ঔষধ প্রদান এবং প্রয়োজনে দাফন পর্যন্ত সহায়তা করা।
কিন্তু স্থানীয় রোগী, কমিটির সদস্য এবং স্বাস্থ্য খাতের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—কমিটির অস্তিত্ব ও বরাদ্দ সম্পর্কে অনেকেই কিছুই জানেন না। তাহলে সরকারি বরাদ্দ কোন খাতে খরচ হচ্ছে। সর্বশেষ ব্যাংক এ্যাকাউন্ট তথ্য বলছে বর্তমানে ১ লাখ ৬১ হাজার ৯২ টাকা আছে। তাহলে বাঁকী বরাদ্দের টাকা গেল কোথায়।
কদমগাছী গ্রামের সুলতানা নামে এক গৃহবধূ বলেন, সমাজসেবা অফিস তো বয়স্কভাতা,প্রতিবন্ধী ভাতা,বিধবা ভাতা দেয় জানি। কিন্তু গরিব দুঃস্থ রোগীর জন্য ঔষধ ও খরচ দেয় এগুলো জানা নেই। অফিস না জানালে আমরা জানবো কিভাবে আর সেবাই পাবো কিভাবে।”
আলেফা বেগম নামে আরেক অসহায় বৃদ্ধা বলেন,“ কোন ঔষধ পত্র পাই না। আমার ঘরে একজন প্রতিবন্ধী ছেলে আছে সেও কোন ঔষধ খরচ পায় না। তাহলে সরকার থেকে আমরা কিছু পাবো না।”
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কমিটির বরাদ্দ থেকে স্যালাইন সরবরাহ হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার টাকার। এর বাইরে আগের কয়েক বছরে কী আসা–যাওয়া হয়েছে হাসপাতাল জানে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কানিস ফারহানা বলেন,“স্যালাইন এসেছে—এ ছাড়া রোগীর চিকিৎসা ব্যয় আমরা পাইনি। কোনো রোগীকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও জানা নেই।”
অভিযোগ শুধু বরাদ্দ লুটপাট হয়েছে এমন নয়, রোগী কল্যাণ কমিটির সভার নথিতেও প্রশ্ন উঠেছে। কমিটির সদস্য সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান ২০১২ সালে মারা যান। কিন্তু নথিতে দেখা যায় তিনি নিয়মিত সভায় উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর করেছেন। আরেক সদস্য এস এম জাকিতুল্লাহ সরদার একজন মুসলমান কিন্তু তার বাবার নামের জায়গায় জগন্নাথ মন্ডল নামে এক হিন্দু ব্যক্তির নাম লেখা হয়েছে। এভাবেই ভূয়া কমিটি দিয়ে চলছে সরকারি বরাদ্দ লুটপাট।
কমিটির সদস্য হাসানুজ্জামান বলেন,“ গত ৮ বছরে কমিটির সভার কোন চিঠি পাই নি। বর্তমানে এর অস্তিত্ব আছে কি না জানা নাই। সভায় আমার স্বাক্ষর থাকলে কেউ জালিয়াতি করেছে। সাংবাদিক মাহবুবুর চাচা ২০১২ সালে তো মারা গেছে—সে কিভাবে স্বাক্ষর করল? এগুলো জালিয়াতি। এসব বিষয়ে নিখুঁত তদন্ত হওয়া উচিৎ।
বদলগাছী সমাজসেবা অফিসের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন বলেন, “আমি গত মাসে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি। আগের বিষয় জানি না। এখন থেকে নিয়মিত কার্যক্রম হবে।” তবে পূর্ববর্তী বরাদ্দের অর্থের সঠিক ব্যয় কোথায় হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
তদন্তের আশ্বাস দিয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি বলেন,“এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন: বরাদ্দ গেল কোথায়?
উপজেলার বিভিন্ন দোকান, হাসপাতাল ও কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—১০ বছরের বেশি সময় ধরে বরাদ্দের তথ্য বাইরে আসেনি। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—
১। বরাদ্দ কোথায় গেল?
২। ভুয়া স্বাক্ষর করল কে?
৩। সভা হয়েছে কোথায়?
৪। রোগীরা সেবা না পেলে টাকার গন্তব্য কোথায়?
স্থানীয় জুলাই যোদ্ধা শুভ বলেন,“এটা সংবেদনশীল খাত। রোগীর চিকিৎসার টাকা হাওয়া,এটা মেনে নেওয়া হবে না। জুলাই স্পিরিটের সাথে যায় না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তীব্র আন্দোলনের কথা জানালেন তিনি।”
ইবনে তাহির মোহাম্মাদ নয়ন নামে স্থানীয় সচেতন নাগরিক বলেন,“ কমিটির সদস্য কবর থেকে মরনোত্তর স্বাক্ষর করছে, এগুলো যাদের দেখার দায়িত্ব তারা আসলে কি করছে। আমার বদলগাছীর অসহায় গরীব মানুষেরা সুবিধা পেল না। সুবিধা পেল অফিস। কারা এসব লুটপাটে জড়িত,তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
অসহায় রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম হলে তা দুর্নীতির শামিল বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তারা বলেন, স্বাস্থ্য ও মানবিক খাতে অনিয়ম হলে তা সরাসরি জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত—এ কারণে দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।






























