১০ উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে বিমানের চুক্তি

বহর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বোয়িংনির্ভর বিমানের বহরে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে গতকাল বুধবার রাতে এ চুক্তি সই হয়। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন। তবে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার মোট বাণিজ্যিক মূল্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তির আওতায় এয়ারবাসের কাছ থেকে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ কিনবে বিমান। চারটি এ৩৫০-৯০০ দীর্ঘ পাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং ছয়টি এ৩২১নিও আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহ ২০৩৩ সালে শুরু হতে পারে এবং পর্যায়ক্রমে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত তা চলতে পারে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিমানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। এয়ারবাসের সঙ্গে এই চুক্তি বিমানের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা এবং বিশ্বজুড়ে নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এয়ারবাসের প্রতিনিধি জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার বলেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত দ্রুত বাড়ছে। বিমানের নতুন যাত্রায় অংশীদার হতে পেরে এয়ারবাস গর্বিত। এ৩৫০ ও এ৩২১নিও উড়োজাহাজ যাত্রীসেবা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে বিমানের জেট উড়োজাহাজের বড় অংশই বোয়িংয়ের তৈরি। নতুন ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হলে বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়ে বহর পরিচালনা করবে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।
এর আগে চলতি বছর দুই দফায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। গত ৩০ এপ্রিল প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়। এর মধ্যে আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ রয়েছে।
এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে আরও ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়। এর মধ্যে পাঁচটি ৭৮৭-১০ এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। দুই দফার চুক্তি মিলিয়ে বোয়িং থেকে বিমানের কেনা উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টি।
এয়ারবাসের ১০টি এবং বোয়িংয়ের ২৫টি নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে বিমানের নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫টি। এর মধ্যে ১৯টি ওয়াইড-বডি এবং ১৬টি ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ।
বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ১৪টি বোয়িং এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮। বহরের কয়েকটি উড়োজাহাজ ইতিমধ্যে পুরোনো হয়ে গেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরও কয়েকটি উড়োজাহাজ বাদ পড়ার কথা রয়েছে।
বিমান সূত্র বলেছে, নতুন উড়োজাহাজগুলো বহরে আসার আগ পর্যন্ত সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে বেশ কয়েকটি ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান। তবে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো কোনো উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বর্তমান বহরের ১৯টি উড়োজাহাজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ২৫টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিমানের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫০ ছাড়াতে পারে। তবে নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে কয়েক বছর বাকি থাকায় অন্তর্বর্তী সময়ে সক্ষমতার ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সেটিও বিমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকছে।
এদিকে নতুন বহর পরিচালনার জন্য বৈমানিক ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেছে বিমান।
এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তিকে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দলের প্রধান মাইকেল মিলার। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এয়ারবাস বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিফলন। তাঁর মতে, এ চুক্তি বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে আরও শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্কের দিকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
বাংলাদেশকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির একটি হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও উল্লেখ করেন মিলার। এ লক্ষ্য অর্জনে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুকও বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানান। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যকে যুক্তরাজ্য জোরালোভাবে সমর্থন করে বলেও জানান তিনি।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি শুধু উড়োজাহাজ কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বৃহত্তর অংশীদারত্বে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বিমানের বহর বাড়ার সঙ্গে দেশে রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও) খাত গড়ে তোলার সম্ভাবনাও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।






























