খুলনায় ভোটের মাঠে নেই কোনো নারী প্রার্থী- ভেঙে গেল অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এবার এসে ঠেকেছে শূন্যের কোঠায়। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারী নেতৃত্ব প্রসারের নানা উদ্যোগ, ঘোষণাপত্র ও নীতিগত অঙ্গীকার থাকলেও খুলনা জেলায় ছয়টি আসনের কোনোটি থেকেই শেষ পর্যন্ত কোনো নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে টিকে থাকেননি।

খুলনা জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর ও জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে এবার মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল মোট ৪৬টি। এর মধ্যে একজন নারী প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিলেও যাচাই–বাছাইয়ে তাঁর প্রার্থীতা বাতিল হয়। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রার্থীদের তালিকা থেকে নারীদের উপস্থিতি পুরোপুরি শূন্য হয়ে যায়।

তথ্য বলছে, নবম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত খুলনার আসনগুলোতে সীমিত হলেও নারীদের উপস্থিতি ছিল ধারাবাহিক। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে ৩৩ জন প্রার্থীর মধ্যে একজন নারী ছিলেন। দশম সংসদ নির্বাচনে ১১ জনের মধ্যে তিনজন নারী, একাদশ নির্বাচনে ৩৭ জনের মধ্যে দুজন এবং দ্বাদশ নির্বাচনে ৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে দুজন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। গড়ে ছয়টি আসনে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ নারী প্রার্থী অংশ নিতেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই অংশগ্রহণ হার নেমে এসেছে শূন্য শতাংশে।

খুলনা উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভানেত্রী ও আইনজীবী শামীমা সুলতানা শিলু মনে করেন— শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা কিংবা উদ্যোক্তা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও দলীয় রাজনীতিতে তাদের সুযোগ খুবই সীমিত। পারিবারিক পরিচয় বা আত্মীয়তার বাইরে নারীরা তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গড়তে গেলে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধার মুখে পড়েন। মানসিকতা ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া নারী প্রার্থী বাড়বে না।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রথমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময়সীমা ছিল ২০২০ সাল। কিন্তু বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০৩০ সাল। তবু দলীয় কমিটিতে নারীদের উপস্থিতি সীমিত, নেতৃত্বের সুযোগ সীমাবদ্ধ, মনোনয়নপর্বে নারীরা বাদ পড়ছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে নীতির প্রভাব দৃশ্যমান হয়নি।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে— খুলনা জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী ছিলেন খুলনা–৫ আসনে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী শামীম আরা পারভীন ইয়াসমীন। গত শুক্রবার যাচাই–বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। এতে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী প্রার্থীর উপস্থিতি পুরোপুরি শূন্যে নেমে আসে। একই চিত্র দেখা গেছে- বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা এই তিন জেলাতেও। মনোনয়ন দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কেউ টিকতে পারেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— নারীদের সাংগঠনিক দায়িত্ব কম, অর্থনৈতিক সক্ষমতা কম, অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন রাজনীতিতে প্রভাবশালী পুরুষ নেতৃত্বের আধিপত্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক চাপে নারী অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হয়। এ কারণে নারীরা মনোনয়ন বাছাইপর্বেই বেশি বাদ পড়েন।

নারী রাজনীতিবিদরা বলছেন- ওয়াদা করা হয়, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কিন্তু মনোনয়ন আসে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- নারীদের মনোনয়নে কোটা বা প্রণোদনা নীতি, তৃণমূল নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ঝুঁকি কমানো, নারীদের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা নিশ্চিত ও সংসদীয় রাজনীতিতে সমান সুযোগ তৈরি। তাদের মতে- যদি প্রতীকী অংশগ্রহণ না চাই এবং প্রকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়তে চাই—তাহলে নারী প্রার্থীদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য।