খুলনায় জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে সম্পদে শীর্ষে কৃষ্ণ নন্দী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতেই জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই ছয় প্রার্থীর মধ্যে সম্পদ, নগদ অর্থ ও আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে অন্যদের তুলনায় বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন খুলনা–১ আসনের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী। তাঁর ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ অন্য পাঁচ প্রার্থীর মোট সম্পদের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি।
খুলনা–১ আসনে ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু শাখার সাবেক সভাপতি কৃষ্ণ নন্দী, খুলনা–২ আসনে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও নগর জামায়াতের সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, খুলনা–৩ আসনে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও নগর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, খুলনা–৪ আসনে জেলা নায়েবে আমির মো. কবিরুল ইসলাম, খুলনা–৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং খুলনা–৬ আসনে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ মনোনয়ন পেয়েছেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতায় এই ছয়জনের মধ্যে তিনজন স্নাতকোত্তর, দুজন কামিল এবং একজন এসএসসি পাস।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, কৃষ্ণ নন্দীর মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ২০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে অস্থাবর সম্পদই প্রায় ১৯ কোটি ২ লাখ টাকা, আর স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। নগদ অর্থের দিক থেকেও তিনি অন্যদের তুলনায় অনেক এগিয়ে। ঋণসহ তাঁর হাতে নগদ রয়েছে ১৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি। তবে তাঁর নামে কোনো ব্যাংক আমানত নেই।
এ বিপুল সম্পদের বিপরীতে কৃষ্ণ নন্দীর দেনাও রয়েছে বড় অঙ্কের। হলফনামা অনুযায়ী তাঁর মোট দেনা প্রায় ১৭ কোটি ৯৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা। অন্য পাঁচ প্রার্থী নিজেদের দেনামুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
বার্ষিক আয়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন খুলনা–২ আসনের প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। আইন পেশা, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি টাকা। তাঁর হাতে নগদ রয়েছে ২০ লাখ টাকা, পাশাপাশি স্থায়ী আমানত রয়েছে ২৪ লাখ টাকা।
এর পরেই রয়েছেন খুলনা–৩ আসনের প্রার্থী ও শিক্ষক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তাঁর বার্ষিক আয় ৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা। তবে তাঁর নামে কোনো নগদ বা ব্যাংক আমানত নেই। সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত রয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদ সবচেয়ে কম—অস্থাবর ৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা এবং স্থাবর মাত্র ১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।
খুলনা–৪ আসনের প্রার্থী মো. কবিরুল ইসলামের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। তাঁর হাতে নগদ ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা জমা রয়েছে। মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২১ লাখ টাকা।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা–৫ আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ারের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। তাঁর নগদ রয়েছে ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে জমা ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৩৩ টাকা। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
খুলনা–৬ আসনের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের বার্ষিক আয় সবচেয়ে কম—৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। তাঁর হাতে নগদ ৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগ রয়েছে ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ টাকা।
হলফনামায় দেখা গেছে, শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের স্ত্রীর নামে প্রায় চার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে, যা তাঁর নিজের সম্পদের প্রায় দ্বিগুণ। মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্ত্রীর সম্পদ ২২ লাখ টাকার বেশি। মো. কবিরুল ইসলামের স্ত্রীর নামে আট ভরি স্বর্ণালংকার ও সামান্য ব্যাংক আমানত রয়েছে। আবুল কালাম আজাদের স্ত্রীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ দুই লাখ টাকার কিছু বেশি। কৃষ্ণ নন্দী ও মাহফুজুর রহমান তাঁদের স্ত্রীদের নামে কোনো সম্পদ দেখাননি।
সর্বশেষ অর্থবছরে আয়কর প্রদানের দিক থেকে শীর্ষে শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল—প্রায় ৪১ হাজার টাকা। কৃষ্ণ নন্দী আয়কর দিয়েছেন ৩০ হাজার ৮০০ টাকা। মিয়া গোলাম পরওয়ার দিয়েছেন ৫ হাজার ৬২৫ টাকা। অন্য প্রার্থীরা দিয়েছেন তিন থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খুলনায় জামায়াতের প্রার্থীদের এই সম্পদচিত্র ভোটের মাঠে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে কৃষ্ণ নন্দীর বিপুল সম্পদ ও বড় অঙ্কের দেনা—দুটি বিষয়ই নির্বাচনী প্রচারণায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রার্থী হওয়ায় খুলনার চারটি আসনেই জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি ও আর্থিক সক্ষমতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে হলফনামার তথ্য বলছে, খুলনায় জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে আর্থিক অবস্থানে সুস্পষ্ট বৈষম্য রয়েছে। আর সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন খুলনা–১ আসনের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী—যিনি সম্পদের দিক থেকে অন্যদের বহু গুণ ছাড়িয়ে গেছেন।






























