সব শ্রেণী-পেশার মানুষ কেন জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন এখন আর মিছিল বা স্লোগানে ধরা পড়ে না। পরিবর্তন আসে নিঃশব্দে মানুষের মনে, আড্ডায়, পারিবারিক আলোচনায়। ঠিক তেমনই এক নীরব বাস্তবতা আজ স্পষ্ট: ক্ষমতার বাইরে থেকেও জামায়াতে ইসলামীর প্রতি দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে।
গ্রাম থেকে শহর, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত তরুণ থেকে পেশাজীবী, এমনকি রাজনীতি-বিমুখ অনেক নাগরিকও নতুন করে জামায়াতকে নিয়ে ভাবছেন। প্রশ্ন উঠছে এই ঝোঁক কি আদর্শিক প্রত্যাবর্তন, নাকি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জামায়াতের দিকে মানুষের ঝোঁকের মূল কারণ তাদের শক্তি নয় বরং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি মানুষের আস্থায় বুলডোজারের আঘাত। একদিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা রাজনীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রশাসনের চরম অপব্যবহার, সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব। ক্ষমতাসীনদের রক্ত চক্ষু, পেশীশক্তি।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনীতির চিত্র নেতৃত্ব সংকট, আন্দোলনের ব্যর্থতা, মাঠপর্যায়ে দুর্বল উপস্থিতি। এই দুই ধারার মাঝখানে সাধারণ মানুষ নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধিহীন মনে করছে। ফলে তারা ভরসাযোগ্যতার খোঁজে নতুন দিকে তাকাচ্ছে। এই বিবেচনায় তারা জামায়াতেকে উত্তম মনে করছেন অনেকেই।
জামায়াত দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বা লুটপাটের অভিযোগ তুলনামূলক অতি কম। মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণীর একাংশের কাছে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অনুসন্ধানে মধ্যে বয়সী রুহীন মোল্লা বলেন ,
“ভালো না হলেও অন্তত দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, পেশীশক্তি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নেই।”
খুলনার রূপসার আব্দুস সালাম, আবুল শেখ যারা কোনো দল করে না, কিন্তু এবার তারা জামায়াতের কর্মী হয়েছেন।
অনেকে বিষয়টিকে শুধুই ধর্মীয় আবেগ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু বাস্তবে জামায়াতমুখী ঝোঁকের পেছনে বড় কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সামাজিক অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয়।
এই বাস্তবতায় “ইনসাফ”, “নৈতিক সমাজ”, “জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র” এই শব্দগুলো মানুষের কাছে আশ্বাসের ভাষা হয়ে উঠছে। জামায়াত এই ভাষাটিই সবচেয়ে ধারালোভাবে ব্যবহার করছে।
রাজনীতির বাইরে জামায়াতের আরেকটি বড় শক্তি তাদের সামাজিক নেটওয়ার্ক। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ত্রাণ কার্যক্রম, দুর্যোগে সহায়তা, স্থানীয় পর্যায়ে মানবিক উদ্যোগ, এসবের মাধ্যমে দলটি বহু এলাকায় সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন।
অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, যেখানে জনপ্রতিনিধি অনুপস্থিত, সেখানে অনেক সময় জামায়াতের কর্মীরাই মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এটি মানবিকতা হোক বা কৌশল রাজনীতিতে এর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ প্রতিবেদককে সাতক্ষীরায় মুজাহিদ নামের যুবক জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে অন্তত কোনো গ্ৰুপিং নেই, নেই ক্ষমতার লড়াই। তাদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে আমাকে আকৃষ্ট করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তরুণদের মধ্যে।তারা প্রচলিত রাজনীতিকে দেখছে ক্লান্তিকর, সংঘাতপূর্ণ ও সুযোগসন্ধানী হিসেবে। জামায়াতের শৃঙ্খলিত কাঠামো, প্রশিক্ষণভিত্তিক কাজ ও আদর্শিক ভাষা তাদের কাছে অন্তত ভিন্ন কিছু বলে মনে হচ্ছে। এটি সরাসরি সমর্থন না হলেও, পুরোনো রাজনীতির প্রতি অনীহার প্রকাশ।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও যশোর -১ সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা আজিজুর রহমান মনে করেন, তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস, মানব সেবা সুখে দুঃখে তাদের সাথী হবার জন্য জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ।
জামায়াতে ইসলামীর দিকে সব শ্রেণীর মানুষের ঝোঁক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সতর্কবার্তা, দেশের মানুষ প্রচলিত রাজনীতির ওপর আস্থা হারাচ্ছে। জামায়াত এই শূন্যস্থান কতটা পূরণ করতে পারবে, তা নির্ধারণ করবে সময় ও তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা উপর।






























