জামায়াত আমিরের প্রতিশ্রুতি: শৃঙ্খলার অনন্য নজির দেখল যশোরবাসি

যশোরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিশাল জনসভাস্থলে সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে উপস্থিত হন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার আগমনের অনেক আগেই পুরো এলাকা এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

নির্ধারিত সময়ের আগেই ঈদগাহ ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের রাস্তাঘাটে লোকে লোকারণ্য সৃষ্টি হয়। সকাল সাড়ে ৮টার আগেই ঈদগাহ ময়দানের মূল সীমানা ছাড়িয়ে লোকসমাগম ছড়িয়ে পড়ে। পাশের মুন্সি মেহেরুল্লাহ ময়দানেও মহিলা কর্মীদের তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হাজার হাজার মানুষ আশপাশের ভবনের ছাদ ও রাস্তায় অবস্থান নেন।

মধ্যরাত থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা দলে দলে জনসভাস্থলে জড়ো হতে থাকেন। সকাল হতে না হতেই পুরো মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আগত নেতা-কর্মীদের হাতে দেখা যায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকসংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। পুরো এলাকায় বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ।

এর আগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল জানান, জামায়াতের আমিরের আগমন উপলক্ষে জনসভায় প্রায় ৩ লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে।

যেসব প্রতিশ্রুতি দিলেন জামায়াত আমির:

যশোরের ঐতিহাসিক নির্বাচনী জনসভায় জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দাবিগুলো পূরণের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. মো. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেছেন, জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা যশোরকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হবে।

যশোরকে একটি আধুনিক ও উন্নত জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার একগুচ্ছ মেগা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তিনি ঘোষণা করেছেন, আগামীতে দল রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে যশোরের দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘ভবদহ জলাবদ্ধতা’র স্থায়ী সমাধান করা হবে। একইসঙ্গে যশোরকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর এবং মেডিকেল কলেজকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তরের অঙ্গীকার করেন তিনি।

মঙ্গলবার দুপুরে যশোরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান বক্তব্যের শুরুতেই জামায়াত আমির যশোরের মানুষের প্রধান দুর্ভোগ ভবদহ জলাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, যশোরের মানুষের দুঃখ ভবদহ। বছরের পর বছর মানুষ আশ্বাস পেলেও সমাধান পায়নি। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে আধুনিক প্রকৌশলগত পরিকল্পনা ও স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতে ভবদহ সমস্যার এমন সমাধান করবে যেন আগামীতে আর কোনো মানুষকে জলাবদ্ধতার শিকার হতে না হয়।

তিনি আরও বলেন, যশোর জেলার অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হবে। গ্রামীণ ও শহরের প্রধান সড়কগুলোর আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হবে। জনসভায় উপস্থিত হাজারো নেতা-কর্মীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা শুধু ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের সেবা করার জন্য রাজনীতি করি। ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ কায়েম হলে যশোরের প্রতিটি মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে।

অনন্য শৃঙ্খলার নজির দেখল যশোরবাসী:

যশোরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে আজ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিশাল জনসভাকে কেন্দ্র করে পুরো শহর যখন জনসমুদ্রে পরিণত, ঠিক তখনই এক অনন্য শৃঙ্খলার নজির দেখল যশোরবাসী। লাখো মানুষের ভিড় সামলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের পথ তৈরি করে দিয়ে ব্যাপক প্রশংসায় ভাসছে দলটির স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী।

মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কার্যদিবস হওয়ায় সকাল থেকেই অফিস-আদালত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা ছিল। বিশেষ করে জনসভাস্থলের পাশের রাস্তাটি সরকারি এমএম কলেজে যাওয়ার প্রধান পথ এবং এই এলাকায় অসংখ্য কোচিং সেন্টার থাকায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীর আনাগোনা থাকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঈদগাহ ময়দান ছাড়িয়ে মানুষের স্রোত যখন আশেপাশের সড়কে আছড়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মনে ভোগান্তির শঙ্কা জেগেছিল।

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। জামায়াতের শত শত স্বেচ্ছাসেবক রাস্তার দু-পাশে মানবপ্রাচীর তৈরি করে মাঝখানে শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ফাঁকা রাখেন। লাখো মানুষের ভিড়ের মধ্যেও কোচিং ও কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। এমনকি জনসভার মাইক চলাকালীন সময়েও স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় সাধারণ পথচারীরা স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন।

এমএম কলেজের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ভেবেছিলাম আজ হয়তো কলেজে যাওয়াই যাবে না। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবকরা যেভাবে ভিড় সরিয়ে আমাদের যাওয়ার রাস্তা করে দিয়েছেন, তা সত্যিই অবাক করার মতো। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই আমরা যাতায়াত করতে পারছি।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সাধারণত জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে, কিন্তু আজকের এই সুশৃঙ্খল পরিবেশ এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় দিল।