পহেলা আষাঢ়ে বৃষ্টিভেজা খুলনা: ঋতুর প্রেমের সঙ্গে ভোগান্তির নগরচিত্র

আজ পহেলা আষাঢ়। বর্ষার প্রথম দিন। বাংলার চিরচেনা ঋতুচক্রে এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয় এটি এক অনুভূতির নাম, এক নরম আবেগের শুরু। আর সেই আবেগেই আজ ভিজেছে খুলনা মহানগরী।
সোমবার (১৫ জুন) দুপুর হতেই আকাশে জমতে শুরু করে ঘন কালো মেঘ। ধীরে ধীরে আলো কমে আসে, বাতাসে ভেসে ওঠে সোঁদা মাটির গন্ধ। তারপর হঠাৎ করেই যেন আকাশ খুলে যায় নেমে আসে মুষলধারে বৃষ্টি।
ব্যস্ত নগরীর ছুটে চলা থমকে দাঁড়ায় কিছুটা সময়ের জন্য। সড়কে ছুটে চলা যানবাহন ধীর হয়ে আসে, ফুটপাতে আশ্রয় নেয় মানুষ। ছাতা খুলে কেউ হাঁটে, কেউবা ভিজে যায় ইচ্ছে করেই। যেন এই বৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে না বলা কোনো গল্প, কোনো অজানা ভালোবাসা।
খুলনার রয়েল মোড়, মুজগুন্নী সড়ক, এমনকি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটক সবখানেই বৃষ্টির ছোঁয়ায় বদলে গেছে চেনা দৃশ্যপট। ধুলো মাখা পথ ধুয়ে গেছে, গাছের পাতায় জমেছে জলের ফোঁটা। ছাদের কার্নিশ বেয়ে টুপটাপ ঝরে পড়া বৃষ্টির শব্দ যেন এক অদৃশ্য সুর তৈরি করেছে।
তবে এই সৌন্দর্যের মাঝেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নগরের চিরচেনা দুর্বলতা। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান গেটে জমে থাকা পানি যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। জরুরি সেবার এই প্রবেশপথে পানি জমে যাওয়ায় রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয়েছে ভোগান্তিতে। কেউ প্যান্ট গুটিয়ে, কেউ জুতা হাতে নিয়ে পার হয়েছেন সেই পানি একটি হাসপাতালের গেটে এমন দৃশ্য অনেকের মনেই প্রশ্ন তোলে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা রুমানা আক্তার রানু বলেন, বৃষ্টি তো ভালো লাগে, কিন্তু হাসপাতালের গেটেই যদি পানি জমে থাকে, তাহলে অসুস্থ মানুষ কীভাবে ভেতরে যাবে? এটা খুবই কষ্টকর।
তার এই কথায় ফুটে ওঠে নগরবাসীর নীরব বাস্তবতা একদিকে প্রকৃতির রোমান্টিকতা, অন্যদিকে নাগরিক ভোগান্তি।
দীর্ঘদিনের তীব্র গরমে ক্লান্ত নগরবাসীর কাছে এই বৃষ্টি যেন এক স্বস্তির পরশ। রোদে পুড়ে যাওয়া শহর হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে শীতল, কোমল। মানুষ যেন একটু থামে, একটু শ্বাস নেয় জীবনের ব্যস্ততার মাঝেই খুঁজে নেয় এক টুকরো প্রশান্তি।
তবে বর্ষার এই রোমান্টিকতার আড়ালেও রয়েছে জলাবদ্ধতা, যানজট আর চলাচলের ভোগান্তি। নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় জমে থাকা পানি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
পহেলা আষাঢ় মানেই শুধু বর্ষার সূচনা নয় এটি স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। কারও মনে পড়ে শৈশবের কাদামাটির দিন, কারও মনে জেগে ওঠে পুরোনো ভালোবাসার গল্প। জানালার পাশে বসে বৃষ্টির শব্দ শোনা, কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে ভেজা পথ হাঁটা এই দিন যেন সেই সব অনুভূতিরই পুনর্জন্ম।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মৌসুমি বায়ু ইতোমধ্যে সারা দেশে সক্রিয় হয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ বর্ষার এই স্নিগ্ধতা, এই ছন্দ আরও কিছুদিন সঙ্গী হবে নগরজীবনের।
পহেলা আষাঢ়ের এই বৃষ্টি যেন কেবল প্রকৃতির রূপান্তর নয় এটি মানুষের মনেরও এক পরিবর্তন। ক্লান্তি, দুঃখ, ব্যস্ততার ভিড়ে এই বৃষ্টি এনে দেয় একটুখানি থামার সুযোগ, একটুখানি অনুভবের সময়।
খুলনা মহানগরী আজ ভিজেছে শুধু বৃষ্টিতে নয় ভিজেছে অনুভূতিতে, স্মৃতিতে, আর অদৃশ্য এক ভালোবাসায়। তবে সেই ভালোবাসার মাঝেই লুকিয়ে আছে শহরের চিরচেনা সংগ্রামের গল্পও।




















