কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের প্রাণকেন্দ্র মুক্তারপুর বাজার

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হরিহরনগর ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত মুক্তারপুর বাজার এক সময় ছিল এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণকেন্দ্র।
ষাটের দশক থেকে শুরু করে ২০১০ সাল পর্যন্ত জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্য, জনসমাগম এবং নদীপথের যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাজারটি ছিল এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু কালের বিবর্তন, যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক নানা ইস্যুর কারণে আজ সেই ঐতিহ্যবাহী বাজারটি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় কপোতাক্ষ নদ ছিল এ অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমারে মানুষ যাতায়াত করত বিভিন্ন স্থানে। সেই সুযোগকে কেন্দ্র করে নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠে মুক্তারপুর বাজার। মুক্তারপুর, সাদিপুর, নিঃপুর, বল্লা, কানাইরালী, তাঁজপুর, গোয়ালবাড়ী, কায়েমকোলা, মহাদেবপুরসহ অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের কেনাবেচা ও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল এই বাজার।
বাজারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নদী পারাপার। প্রতিদিন শত শত মানুষ কপোতাক্ষ নদের এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাতায়াত করতেন। মৃত খোরসেদ আলীর নৌকা ছিল সে সময়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য পারাপারের মাধ্যম। নদীঘাট ঘিরে প্রতিদিন সৃষ্টি হতো কর্মচাঞ্চল্য ও মানুষের পদচারণা।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও সোমবার বসত বৃহৎ গ্রামীণ হাট। হাটে পান-সুপারি, দেশি মাছ, শাকসবজি, মিষ্টান্নসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্য পাওয়া যেত। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা আসতেন এ হাটে। বাজারের পাশেই অবস্থিত মুক্তারপুর-গোয়ালবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আনাগোনাতেও বাজারটি ছিল সবসময় সরগরম।
বর্তমানে বাজারটির অবস্থা অত্যন্ত করুণ। একসময় যেখানে শতাধিক দোকান ছিল, সেখানে এখন টিকে আছে মাত্র ১০ থেকে ১২টি দোকান। বাজারের বিভিন্ন স্থানে জমেছে ময়লার স্তূপ। অবকাঠামোর অভাব, নদীর নাব্যতা সংকট এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় বাজারটি ধীরে ধীরে তার ঐতিহ্য হারিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল মালেক বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় মুক্তারপুর বাজার ছিল এলাকার সবচেয়ে ব্যস্ত বাজারগুলোর একটি। হাটের দিনে মানুষের ভিড়ে হাঁটা দায় হয়ে যেত। এখন সেই বাজার প্রায় বিলুপ্তির পথে।”
প্রবীণ সমাজসেবক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “নদীপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাজারের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। তারপর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্থানীয় বিরোধের কারণেও বাজারটি আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সাইদুর রহমান বলেন, “বাজারটি সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আবারও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। প্রশাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন।”
এলাকাবাসীর দাবি, ঐতিহ্যবাহী মুক্তারপুর বাজারকে সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। অন্যথায় এক সময়ের প্রাণচঞ্চল এই জনপদ ও ইতিহাসের সাক্ষী বাজারটি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা তাদের।





























