সাহাবুদ্দিনের গুলশানের বাড়িতে চলছে পরিচ্ছন্নতা, পাবেন যেসব সুযোগ-সুবিধা

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাজধানীর গুলশানে তার ব্যক্তিগত বাসভবনে চলছে পরিচ্ছন্নতার কাজ। বাড়ির নিচতলার বসার জায়গাটি নতুন করে রং করা হচ্ছে, পরিষ্কার করা হচ্ছে আসবাবপত্র।
বাড়ির ব্যবস্থাপনা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি বাসায় ফিরতে পারেন—এমন প্রস্তুতি নিয়েই কাজ চলছে। বাড়িটির পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটটিতে মো. সাহাবুদ্দিন থাকতেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) সকালে গুলশানের ১২৩ নম্বর সড়কে অবস্থিত বাড়িটিতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। বাড়ির সামনে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী অবস্থান করছিলেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যকে সেখানে দেখা যায়নি। ভেতরে ভাড়াটিয়াদের গাড়ির চালকেরা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছিলেন।
বাড়ির ব্যবস্থাপক কবির হোসেন বলেন, ‘স্যার কবে আসবেন, আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে আমাদের সবকিছু পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করে রাখতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ করছি। স্যার কয়েক দিনের মধ্যেই বাসায় আসতে পারেন।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের পাশেই একটি বসার কক্ষ রয়েছে। সেখানে কয়েকটি সোফা ও একটি টেবিল রাখা আছে। আসবাবগুলো পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কক্ষের এক পাশে রঙের কয়েকটি কৌটা রাখা হয়েছে। দেয়ালের পুরোনো রং ঘষে তুলে নতুন করে রং করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কবির হোসেন বলেন, প্রথমে রং করা হবে। এরপর সোফাগুলো পরিষ্কার করা হবে। লোকজন আসবেন, বসবেন—সেই কারণেই জায়গাটি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের পর তিনি গুলশানের ব্যক্তিগত বাসভবনে ফিরবেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ধারণা রয়েছে। যদিও তিনি ঠিক কবে বাসায় ফিরবেন, সে বিষয়ে বাড়ির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
তবে বাড়িতে চলমান পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ দেখে বোঝা যায়, তার ফিরে আসার সম্ভাবনা সামনে রেখেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বাড়ির নিচতলার বসার জায়গাটিকেই নতুন করে সাজিয়ে তোলার কাজ চলছে।
গতকাল বিকালে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র পাঠান মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগপত্র হাতে পাওয়ার পর সংসদ ভবনের শপথকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জানান স্পিকার। একই সঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের কথাও ঘোষণা করেন স্পিকার।
মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন। অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। সে হিসাবে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ২১ মাস আগে বঙ্গভবন ছাড়ছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গভবন ছেড়ে মো. সাহাবুদ্দিনের রাজধানীর গুলশানে নিজের বাসায় ওঠার কথা রয়েছে। সে কারণে কয়েক দিন ধরেই ওই বাসা বসবাসের উপযোগী করে গোছানো হচ্ছিল। পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সেখানে নেওয়া হয়েছে।
পদত্যাগের পরও সাহাবুদ্দিন যেসব সুযোগ-সুবিধা পাবেন
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বহুল আলোচিত-সমালোচিত মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। এদিন বিকাল ৫টা ১ মিনিটে স্পিকার তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। পদ শূন্য হওয়ায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকবেন।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলেও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অবসরভাতা, চিকিৎসাসুবিধাসহ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি কী কী সুবিধা পান, তা বলা আছে রাষ্ট্রপতির অবসর ভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইনে।
এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে কমপক্ষে ছয় মাস দায়িত্ব পালন শেষে পদত্যাগ করলে অথবা মেয়াদ শেষ হলে মৃত্যুর আগপর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বশেষ যে মাসিক বেতন পেতেন, তার ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক অবসর ভাতা পাবেন। ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রিমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট, ১৯৭৫ (মে ২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) অনুযায়ী বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই হিসাবে অবসরের পর মো. সাহাবুদ্দিন মাসে ৯০ হাজার টাকা অবসর ভাতা পাবেন।
আইনানুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে অন্য কোনো চাকরি বা পদ থেকে অবসরে গিয়ে অবসর ভাতা গ্রহণ করলে তিনি ওই অবসর ভাতা এবং রাষ্ট্রপতির অবসর ভাতার মধ্যে তার ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো একটি পাওয়ার যোগ্য হবেন। রাষ্ট্রপতি অবসর ভাতা গ্রহণ করে মারা গেলে তার বিধবা স্ত্রী অথবা ক্ষেত্রমতে বিপত্নীক স্বামী তার প্রাপ্য অবসর ভাতার দুই-তৃতীয়াংশ হারে আমৃত্যু মাসিক ভাতা পাবেন।
অবসর ভাতা গ্রহণের প্রাধিকার অর্জন করা সাবেক কোনো রাষ্ট্রপতি অবসর ভাতার পরিবর্তে আনুতোষিকও (এককালীন অর্থ) গ্রহণ করতে পারবেন। এ জন্য তাকে প্রাধিকার অর্জনের তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে অবসর ভাতার পরিবর্তে আনুতোষিক গ্রহণের ইচ্ছার কথা জানাতে হবে। আনুতোষিকের পরিমাণ এক বছরের জন্য প্রদেয় অবসর ভাতার তত গুণ হবে, যত বছর কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকার সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আংশিক বছরকে পুরো বছর হিসেবে গণনা করা হবে।
কোনো ব্যক্তি ছয় মাসের বেশি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় আনুতোষিক পাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত না করে অথবা অবসর ভাতা গ্রহণ না করে মারা গেলে তিনি আনুতোষিক পাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন বলে গণ্য হবে। তখন আনুতোষিকের টাকা মনোনীত ব্যক্তি অথবা উত্তরাধিকারীরা পাবেন বলে আইনে বলা হয়েছে।
অবসরে যাওয়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে অন্যান্য কিছু সুবিধাও পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন। আইনানুযায়ী তিনি একজন ব্যক্তিগত সহকারী ও একজন অ্যাটেনডেন্ট (সাহায্যকারী) পাবেন। দাপ্তরিক ব্যয়ও পাবেন, যার মোট বার্ষিক পরিমাণ সময়ে সময়ে সরকার নির্ধারণ করবে। একজন মন্ত্রীর প্রাপ্য চিকিৎসা সুবিধার সমপরিমাণ চিকিৎসা সুবিধাদি পাবেন সাবেক রাষ্ট্রপতি।
এ ছাড়া সরকারি অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য বিনা মূল্যে সরকারি যানবাহন ব্যবহার, আবাসস্থলে একটি টেলিফোন সংযোগ পাবেন এবং সরকার সময়ে সময়ে নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত এর বিল পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি কূটনৈতিক পাসপোর্টও পাবেন। তখন তিনি দেশের ভেতর ভ্রমণকালে সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্টহাউসে বিনা ভাড়ায় অবস্থানের সুবিধা পাবেন।
আইনানুযায়ী চিকিৎসাসুবিধা, কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং দেশের ভেতরে সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্টহাউসে বিনা ভাড়ায় অবস্থানের সুবিধা তার স্ত্রীও পাবেন।
কী কী কারণে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি অবসর ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন না, তা–ও উল্লেখ আছে আইনে। এগুলো হলো রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব শেষে এমন কোনো দপ্তরে, আসনে, পদে বা মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করে নির্ধারিত তহবিল (সংযুক্ত তহবিল) থেকে বেতন বা অন্য কোনো সুবিধা পেলে রাষ্ট্রপতির অবসর ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যাবে না।
অবসর ভাতার প্রাধিকার পাওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হলেও ওই সব সুবিধা পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া অসাংবিধানিক পন্থায় বা অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বলে উচ্চ আদালত ঘোষণা করলেও সাবেক কোনো রাষ্ট্রপতি ওই সুবিধা পাবেন না।





























