নেপালের রাসুয়ায় দেখার কী আছে, সেখানে এত পর্যটক যায় কেন?

নেপাল বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বরফঢাকা হিমালয়, পাহাড়ি পথ আর মেঘের রাজ্য। দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডুর বাইরে এমন অনেক অঞ্চল আছে, যেখানে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে প্রতিটি দৃশ্য। তারই একটি রাসুয়া। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই জেলা একদিকে যেমন পাহাড়, হ্রদ, বন ও ঝরনা, অন্যদিকে তেমনি তিব্বতের সীমান্তঘেঁষা অবস্থান ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিও বাড়িয়েছে এর গুরুত্ব। এই পাহাড়, হ্রদ আর অ্যাডভেঞ্চারের টানে ছুটে যেতেন পর্যটকরা।

তবে এখন এসবই অতীত। সম্প্রতি ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কারণে সেই রাসুয়াই এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। ২৬ আগস্ট হিমবাহ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে সৃষ্ট প্রবল জল-ধ্বংসযজ্ঞে রাসুয়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেসে যায় সেতু, সড়ক, বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সীমান্তপথে চলাচলকারীদের অনেকেই নিখোঁজ হন।

কেন এত পর্যটক যেতেন রাসুয়ায়?
আকস্মিক এই বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতোই বেশি যা আজকের রাসুয়ার সঙ্গে কোনো মিল নেই। তবে এখানে আমরা আগের সেই চিরচেনা রাসুয়ার চিত্রই তুলে ধরছি। কেন এই জায়গা এত জনপ্রিয় ছিল ভ্রমণপিপাসুদের জন্য। কারণ এই দুর্ঘটনায় প্রায় ৫০০-এর বেশি পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। কেন রাসুয়ায় পর্যটকরা যেতেন, চলুন রাসুয়ার সেই রূপ নিয়েই কথা বলা যাক। সেখানে দেখার মতো কী কী ছিল সবই জানাবো-

রাসুয়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর প্রকৃতি। জেলার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে লাংটাং ন্যাশনাল পার্ক। কাঠমান্ডু থেকে তুলনামূলকভাবে সহজে পৌঁছানো যায় বলে এটি নেপালের জনপ্রিয় ট্রেকিং গন্তব্যগুলোর একটি। পার্ক ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে বরফঢাকা পাহাড়, হিমবাহ, ঘন বন, পাহাড়ি নদী এবং উচ্চতার নানা হ্রদ। লাংটাং লিরুং এখানকার অন্যতম প্রধান পর্বতশৃঙ্গ, যার উচ্চতা ৭ হাজার ২৪৫ মিটার।

রাসুয়ার সৌন্দর্যের আরেকটি বড় অংশ হলো লাংটাং উপত্যকা। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এগিয়ে যাওয়া ট্রেইল, চারপাশে তুষারঢাকা চূড়া এবং ছোট ছোট পাহাড়ি জনপদ সব মিলিয়ে ট্রেকারদের জন্য এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কয়েক দিন প্রকৃতির মধ্যে কাটাতে চান এমন পর্যটকদের কাছেও জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণীয়।

গোসাইকুণ্ড: ধর্ম আর প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন
রাসুয়ার সবচেয়ে পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি গোসাইকুণ্ড হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৩৮০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পবিত্র হ্রদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এটি লাংটাং ট্রেকিং ট্রেইলের অংশ এবং প্রতিবছর হাজারো তীর্থযাত্রী এখানে আসেন। বিশেষ করে জনাই পূর্ণিমার সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়।

গোসাইকুণ্ডকে ঘিরে রয়েছে শিবের পৌরাণিক কাহিনি। বিশ্বাস করা হয়, সমুদ্র মন্থনের সময় বিষ পান করার পর শিবের গলা জ্বলে উঠলে তিনি হিমালয়ে এসে ত্রিশূল দিয়ে পাহাড়ে আঘাত করেন। সেখান থেকে বের হওয়া ঠান্ডা পানির ধারা জমেই গোসাইকুণ্ড হ্রদের সৃষ্টি। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে বরফশীতল নীল পানির হ্রদ এবং চারপাশের পাহাড়ি দৃশ্য মিলিয়ে জায়গাটি হয়ে উঠেছে পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।

শুধু পাহাড় নয়, আছে উষ্ণ প্রস্রবণও
রাসুয়ার আরেকটি আকর্ষণ হলো স্যাফ্রুবেশি ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকা। স্যাফ্রু তাতোপানি নামে পরিচিত প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে এখানে। পাহাড়ি পথ ধরে দীর্ঘ ট্রেকিংয়ের পর উষ্ণ পানিতে শরীর ভেজানোর অভিজ্ঞতা অনেক পর্যটকের কাছে আলাদা আনন্দের। রাসুয়ার পর্যটন পরিকল্পনাতেও এই উষ্ণ প্রস্রবণকে জনপ্রিয় প্রাকৃতিক আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তামাং সংস্কৃতির স্বাদ
রাসুয়ার পর্যটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানকার মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি। তামাং হেরিটেজ ট্রেইল পর্যটকদের পাহাড়ি প্রকৃতির পাশাপাশি স্থানীয় তামাং সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, পোশাক, ঘরবাড়ি, কারুশিল্প ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেয়। এই ট্রেইল ধুনচে বা স্যাফ্রুবেশি থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি গ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। গাতলাং, থুমান, তিমুরে ও ব্রিদ্দিমের মতো জনপদ এই সাংস্কৃতিক যাত্রাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তিব্বত সীমান্তের আলাদা আকর্ষণ
রাসুয়ার ভৌগোলিক অবস্থানও এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। জেলার উত্তরে রয়েছে চীনের তিব্বত অঞ্চল। রাসুয়াগাড়ি সীমান্তপথ কাঠমান্ডু ও তিব্বতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যপথ। ফলে পর্যটনের পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার কারণেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দিয়েই তিব্বতের বিভিন্ন ধর্মীয় গন্তব্যের দিকে যাতায়াত করেন বহু মানুষ। ফলে রাসুয়ার পাহাড়ি সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তভ্রমণ ও তীর্থযাত্রার আকর্ষণ।

সেই সৌন্দর্যেই এবার নেমেছে ভয়াবহ বিপর্যয়
কিন্তু ২৬ আগস্টের আকস্মিক বন্যা রাসুয়ার চেনা চিত্র অনেকটাই বদলে দিয়েছে। হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধসের পর পাহাড়ি নদীপথে পানি, কাদা, বরফ ও পাথরের প্রবল স্রোত নেমে আসে। রাসুয়া জেলার বসতি ও পর্যটনপথের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। সেতু ও সড়ক ধ্বংস হওয়ায় অনেক এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

২৮ আগস্টের হিসাবে নেপালে এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ৪৬৯-এ পৌঁছেছে এবং নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। উদ্ধারকাজের মধ্যেই ভূমিধসে তৈরি একটি হ্রদ উপচে পড়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

রাসুয়া তাই শুধু পর্যটনের গল্প নয়, হিমালয়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার ভয়ংকর ভঙ্গুরতারও এক বাস্তব উদাহরণ। পাহাড়, হ্রদ, বন আর মানুষের সংস্কৃতির টানে যে অঞ্চল প্রতিবছর পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেখানে প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অসহায়তাও দেখিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে রাসুয়া আবার পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে উদ্ধার, পুনর্গঠন ও নিরাপদ পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, নেপাল ট্যুর, রয়টার্স