জলবায়ুর বদলে যাওয়া সমীকরণে বিপন্ন কৃষি: চিরতরে বিলীন হতে পারে বিস্তীর্ণ আবাদী জমি

বাংলাদেশের কৃষকের কাছে আবহাওয়া কোনো অমূলত ভাবনা নয়। কখন বৃষ্টি হবে, কতদিন রোদ থাকবে, শীত কখন নামবে, নদীর পানি কখন বাড়বে-এসবের ওপর নির্ভর করে বীজ বোনা থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত পুরো কৃষি পঞ্চিকা পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু সেই পরিচিত ও দীর্ঘদিনের সুনির্দিষ্ট হিসাব এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য থাকছে না।

কখনো অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ অনাবৃষ্টি, কখনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত তাপমাত্রা, আবার উপক‚লীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার ভয়াবহ চাপ-জলবায়ুর চরম পরিবর্তনশীলতা বাংলাদেশের কৃষিকে এক অভ‚তপূর্ব বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেবল উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল যথেষ্ট নয়; কৃষিকে একই সঙ্গে উৎপাদনশীল, জলবায়ু-অভিযোজনক্ষম ও পরিবেশবান্ধব বা টেকসই করতে হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের উদ্বেগ ও ফলন হ্রাসের প্রক্ষেপণ
বিশ্ব ব্যাংকের ‘বাংলাদেশের জলবায়ু-সহনশীল কৃষি বিনিয়োগ পরিকল্পনা’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের চরম পরিবর্তনশীলতাকে বাংলাদেশের কৃষির জন্য প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ওই পরিকল্পনার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় ২০৪০ সালে ধানের ফলন সামগ্রিকভাবে প্রায় ৪ শতাংশ, গমের ফলন ৫.১ শতাংশ এবং সবজির ফলন ৬.৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিস্তীর্ণ আবাদযোগ্য জমি চিরতরে হারানোর গুরুতর ঝুঁকির কথাও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋতুর পুরোনো ছক কি বদলে যাচ্ছে?
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ঋতুভিত্তিক চাষাবাদ। আমন, বোরো, আউশ কিংবা বিভিন্ন রবি ও খরিফ ফসলের ফলনের জন্য কৃষকের হাতে ছিল বছরের পর বছর ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞান। কিন্তু বর্তমান জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা সেই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পূর্বানুমানের নির্ভরযোগ্যতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।

হঠাৎ অতিরিক্ত বৃষ্টিতে বীজতলা বা সদ্য রোপণ করা চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আবার বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে কৃত্রিম সেচের প্রয়োজন ও খরচ বহুগুণ বাড়ছে। তদুপরি, ফসলের বৃদ্ধির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা দেখা দিলে পরাগায়ন ব্যাহত হয়ে চ‚ড়ান্ত ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ কারণে কৃষি ব্যবস্থাপনায় এখন শুধু ‘কোন ফসল চাষ করব’-এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে কখন চাষ করব, কোন নতুন জাত ব্যবহার করব এবং পানি কীভাবে সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনা করব।

সব অঞ্চলের সমস্যা এক নয়: প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক পদক্ষেপ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বাংলাদেশের সব কৃষি অঞ্চলে একই রকম নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝুঁকিগুলোর ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন:
উপক‚লীয় এলাকা: তীব্র লবণাক্ততা, সমুদ্রের নোনা জলচ্ছাস ও ঘূর্ণিঝড়ের স্থায়ী ঝুঁকি।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল: খরা ও ভ‚গর্ভস্থ সেচের পানির চরম অপ্রাপ্তি।

নদী অববাহিকা ও চরাঞ্চল: আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

এই বৈচিত্র্যের কারণে বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের কৃষি-সমাধান কোনো একক সার্বজনীন মডেলে সম্ভব নয়। কোথাও লবণাক্ততা সহনশীল জাত, কোথাও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাত, কোথাও পানি-সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, আবার কোথাও জমে থাকা অতিরিক্ত পানি দ্রæত নিষ্কাশনের আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োজন। এই অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতাই বর্তমান কৃষি অভিযোজন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

উপক‚লে লবণাক্ততার সঙ্গে কঠিন লড়াই
উপক‚লীয় কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগজনক দিক হলো মাটির ও পানির লবণাক্ততা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ¡াস এবং শুষ্ক মৌসুমে অভ্যন্তরে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের কারণে মাটির সার্বিক উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং সেচের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের ‘জলবায়ু-সহনশীল কৃষি’ (ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি) পরিকল্পনায় উপক‚লীয় অঞ্চলের এই ভয়াবহ ঝুঁকি এবং কৃষির ওপর এর প্রভাবকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।

এই সংকট কাটাতে লবণাক্ততা সহনশীল জাতের দ্রæত সম্প্রসারণ, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, ফসল বৈচিত্র্যায়ন এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি ছড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কৃষি তথ্য ব্যবস্থায় বিভিন্ন ফসলের আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, কৃষকের জন্য সঙ্খ্যিক তথ্য এবং নিয়মিত কৃষি-আবহাওয়া সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

উত্তরের কৃষিতে পানির সংকট ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষির প্রধানতম সংকট দাঁড়িয়েছে পানির প্রাপ্যতা। সেখানকার কৃষি বৃষ্টির ওপর অত্যাধিক নির্ভর হওয়ায় অনাবৃষ্টির সময় ফসল চরম ঝুঁকিতে পড়ে। আবার পুরোপুরি সেচনির্ভর কৃষিতে পানির চাহিদা লাগামহীনভাবে বাড়লে উৎপাদন খরচ বহুলাংশে বেড়ে যায়।

তাই উত্তরের কৃষি সুরক্ষায় শুধু নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন নয়, বরং সেচের পানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পানি-সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি, সঠিক সময়ে পরিমিত সেচ প্রয়োগ, মাটির প্রাকৃতিক আর্দ্রতা সংরক্ষণ এবং স্থানীয় ভ‚গর্ভস্থ ও ভ‚উপরিস্থ পানি সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৃষির জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে মূল ভ‚মিকা রাখতে পারে।

তাপমাত্রা বাড়লে কৃষির সমীকরণও বদলায়
অতিরিক্ত ও অসময়ের তাপমাত্রা কৃষির জন্য কেবল একটি আবহাওয়াগত বৈরী পরিস্থিতি নয়; এটি ফসলের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আঘাত হানে। ফসলের বৃদ্ধি, ফুল আসা, পরাগায়ন, দানা গঠন এবং ক্ষতিকারক রোগ-পোকার বিস্তারের ওপর উচ্চ তাপমাত্রার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে সংবেদনশীল বা দানা বাঁধার পর্যায়ে তাপপ্রবাহ দেখা দিলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

এ কারণে উচ্চ-তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এমন নতুন উদ্ভাবিত জাত ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বপন বা রোপণের সময়সূচি নতুন করে পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে। সরকারিভাবেও লবণাক্ততার পাশাপাশি খরা, জলমগ্নতা ও উচ্চ-তাপমাত্রা সহনশীল নতুন ফসলের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ে কৃষকের মানিয়ে নেওয়ার লড়াই
সরকারি কাঠামোর অপেক্ষায় না থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের অনেক কার্যকর কৌশল স্থানীয় কৃষকেরা নিজেদের মাঠেই তৈরি করে নিচ্ছেন। পরিবর্তনশীল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে কৃষকেরা নানা কৌশল গ্রহণ করছেন:

১. জাত ও সময় পরিবর্তন: কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায় এমন স্বল্পমেয়াদি জাত বেছে নেওয়া এবং রোপণের সময়সূচি বদলানো।

২. প্রযুক্তির ব্যবহার: ফসল বৈচিত্র্য বাড়ানো, জমি উঁচু তল পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা এবং নতুন স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ।

তবে মাঠপর্যায়ে এই অভিযোজনের সক্ষমতা নির্ভর করে কৃষকের ব্যক্তিগত আর্থিক সামর্থ্য, সময়মতো সঠিক তথ্যপ্রাপ্তি, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং স্থানীয় কৃষি-পরিবেশের ওপর। এখানেই কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার মূল ভ‚মিকা চলে আসে। গবেষণাগারে কোনো বৈজ্ঞানিক জলবায়ু-সহনশীল জাত উদ্ভাবন করলেই তার সুফল সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছায় না; কৃষককে সেই জাত সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে, বীজের সহজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং উৎপাদিত পণ্যের লাভজনক বাজার তৈরি করতে হবে।

গত ৫ বছরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকের চিত্র
বাংলাদেশে কৃষকদের মাঝে জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে সরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে বিপুলসংখ্যক কৃষক জনগোষ্ঠীর তুলনায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকের সংখ্যা এখনও সীমিত।

গত ৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
সরকারি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিশ^ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রকল্পসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তহবিলের আওতায় সম্প্রতি ৩২,০০০ কৃষককে সরাসরি জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভিযোজন কৌশলের ওপর মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিক পরিসংখ্যান: এছাড়া আবহাওয়া সেবা প্রকল্প ও বিভিন্ন সংস্থার অধীনে আরও কয়েক লক্ষ কৃষককে আবহাওয়া সংক্রান্ত মোবাইল বার্তা ব্যবহারের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী খেতের মাধ্যমে সচেতন করা হয়েছে। তবে দেশের প্রায় ১ কোটি ১৯৬৫ লাখের বেশি কৃষক পরিবারের সাপেক্ষে এই প্রশিক্ষণের আওতা মোট কৃষকের মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশের মতো, যা মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি দ্রæত বিস্তারের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
উদ্ভাবন সত্তে¡ও কৃষক কেন প্রযুক্তির দিকে এগোতে পারছেন না?

গবেষণাগারে খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল বীজ বা আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তি উদ্ভাবন হলেও সাধারণ কৃষকের মাঠে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে না পড়ার পেছনে বেশ কিছু বাস্তবিক ও আর্থ-সামাজিক বাধা রয়েছে:
১. মূলধনের অভাব ও প্রাথমিক খরচের চাপ: বিন্দু সেচ, সৌরচালিত জলসেচ পাম্প, উঁচু তল কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ লাগে অনেক বেশি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সেই আর্থিক সামর্থ্য নেই এবং তাঁরা সময়মতো সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পান না।

২. তথ্যের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সুযোগের অভাব: আবহাওয়া ও আধুনিক প্রযুক্তি সংক্রান্ত সেবা ব্যবস্থা থাকলেও গ্রামীণ প্রান্তিক কৃষকদের একটি বড় অংশ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারে সক্ষম নন কিংবা এসব তথ্য সম্পর্কে সচেতন নন।

৩. বীজের সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা: গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ নতুন জলবায়ু-সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করলেও মাঠপর্যায়ে সেই মানসম্মত বীজের পর্যাপ্ত জোগান বা বিক্রেতাদের কাছে সহজলভ্যতা থাকে না।
৪. অতিরিক্ত ঝুঁকির ভয় ও চিরাচরিত মানসিকতা: কৃষকেরা বছরের পর বছর ধরে ব্যবহৃত পুরোনো চাষাবাদ পদ্ধতি সহজে ছাড়তে চান না। নতুন প্রযুক্তি বা নতুন জাতের ফসল ফলিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হলে সেই লোকসান বইবার মতো আর্থিক সুরক্ষাবলয় (যেমন কৃষি বীমা) তাঁদের নেই।

৫. সম্প্রসারণ কর্মীদের অপ্রতুলতা: মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় নিয়মিত নিবিড় প্রশিক্ষণ ও সরাসরি তদারকি সম্ভব হয় না।

জলবায়ু-সহনশীল কৃষি কেন জরুরি?
জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র বাস্তবতায় সারা বিশে^ই বর্তমানে জলবায়ু-সহনশীল কৃষির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য তিনটি দিককে একসঙ্গে সফল করা: কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের নেট আয় বৃদ্ধি করা।
জলবায়ুর যেকোনো অভিঘাত ও প্রতিক‚লতা সহ্য করার ক্ষমতা অর্জনে কৃষককে সক্ষম করা।

যেখানে সম্ভব কৃষি খাত থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ কমিয়ে আনা।

বাংলাদেশেও এই বিশ^জনীন ধারণার আলোকে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে। বিশ^ব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো সেচনির্ভর কৃষি ও মৎস্য খাতের উৎপাদনশীলতা ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটানো। প্রকল্পের সাম্প্রতিক অগ্রগতির প্রতিবেদনেও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনাকে বাংলাদেশের কৃষির টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না: প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের কৃষির সামনে আজ এক মৌলিক প্রশ্ন-সীমিত জমি, জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের সংকটের মধ্যে কীভাবে নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও লাভজনক উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ঢালাওভাবে রাসায়নিক সার, অতিরিক্ত সেচ বা মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

এর বদলে প্রয়োজন:
উন্নত ও জলবায়ু-সহনশীল নতুন জাতের বীজ।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা।

আধুনিক পানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও ফসলের বৈচিত্র্যায়ণ।
নিয়মিত ও নির্ভুল আবহাওয়ার তথ্য এবং মাঠপর্যায়ে সময়োপযোগী সঠিক কৃষি পরামর্শ।

এর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক ও ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বৈরী জলবায়ু সামলে কষ্ট করে ফসল ফলানোর পর কৃষক যদি বাজারে উপযুক্ত দাম না পান, তবে অভিযোজনের সম্পূর্ণ সরকারি ও সামাজিক ব্যবস্থাটি অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়বে।

কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে সময়োপযোগী ও নির্ভুল তথ্য জলবায়ু পরিবর্তনের এই গতিশীল যুগে কৃষি সংক্রান্ত তথ্যের গুরুত্ব যেকোনো উপকরণের চেয়ে বেশি। বৃষ্টির সম্ভাবনা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পূর্বাভাস, ক্ষতিকারক রোগ-পোকার আগাম সতর্কতা, কখন সেচ দিতে হবে এবং কোন মৌসুমে কোন জাত উপযুক্ত-এসব তথ্য সঠিক সময়ে হাতের নাগালে পেলে কৃষক পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে অনেক বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পারেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বর্তমানে ‘কৃষকের জানালা’, ‘কৃষকের ঠিকানা’ এবং ‘কৃষি আবহাওয়া মোবাইল মাধ্যম’-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা চালু রয়েছে। তবে কেবল এই প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই শেষ কথা নয়; মাঠের একদম প্রান্তিক কৃষক কতটা সহজে, নিরবচ্ছিন্নভাবে ও নির্ভুলভাবে এই তথ্যগুলো ব্যবহার করতে পারছেন, তার ওপরই এই সুবিধার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করছে।

কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে অভিযোজনের গতির ওপর
বাংলাদেশের কৃষি অতীতে অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েও কৃষকদের সহনশীলতায় টিকে থেকেছে। নদীভাঙন, প্রলয়ঙ্করী বন্যা, জলোচ্ছ¡াস কিংবা সাময়িক খরা-এসব কৃষকের অভিজ্ঞতায় নতুন কিছু নয়। কিন্তু চলমান জলবায়ু পরিবর্তন সেই চ্যালেঞ্জের ধরন ও মাত্রাকে বহুগুণ জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলছে।

ফলে এখন আর দুর্যোগ বা ক্ষতি হওয়ার পর কৃষককে ত্রাণ ও সহায়তা দেওয়ার পুরোনো নিয়মে থাকলে চলবে না; বরং ক্ষতি হওয়ার আগেই আগাম ঝুঁকি কমানোর সুদূরপ্রসারী ও টেকসই পরিকল্পনা নিতে হবে। জলবায়ু সহনশীল জাত, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের আধুনিক কৃষি পরামর্শ, আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস ব্যবস্থা, কৃষি বীমা প্রবর্তন, সহজ শর্তে অর্থায়ন ও কার্যকর বাজার অবকাঠামোকে একই সমন্বিত কৃষি অভিযোজন কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

শেষ কথা জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিখাতের জন্য কোনো দূরবর্তী বা ভবিষ্যতের আশঙ্কামাত্র নয়; এটি বর্তমানের এক রূঢ় ও কঠিন বাস্তবতা, যার প্রভাব মোকাবিলার পূর্ণ প্রস্তুতি এখনই নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ুর এই অসম যুদ্ধে কৃষককে কখনোই একা ফেলে রাখা যাবে না।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল নতুন নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন অব্যাহত রাখতে হবে, সম্প্রসারণ কর্মীবাহিনীকে মাঠে নির্ভুল ও আধুনিক তথ্য দ্রæত পৌঁছে দিতে হবে, নীতিনির্ধারকদের অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং প্রান্তিক কৃষককে দিতে হবে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষা।

কারণ, কৃষির জলবায়ু সহনশীলতার ওপরই সরাসরি টিকে রয়েছে পুরো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব। দ্রæত পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি কতটা দক্ষতার সঙ্গে বদলাতে পারবে-তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশ।