৮৬ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে গমের উৎপাদন মাত্র ১১ লাখ টন

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার রেকর্ড গড়লেও মুদ্রার উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে এক বিশাল শূন্যতা। দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ও শিল্পের দ্রæত প্রসারের কারণে গমের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও, উৎপাদন যেন আটকে আছে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে গমের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮৬ লাখ টন। কিন্তু এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১ লাখ টন।
অর্থাৎ, দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮৭ শতাংশই মেটাতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। বিশাল এই উৎপাদন-ঘাটতি শুধু যে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে তা নয়, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও এক পাহাড়সম চাপ সৃষ্টি করেছে।
যে কারণে বাড়ছে গমের চাহিদা:
গত এক দশকে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা, নগরায়ণ ও খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সকালের নাস্তায় ভাত বা পান্তার জায়গা দখল করেছে রুটি, পরোটা। এর পাশাপাশি ফাস্টফুড, নুডলস, বিস্কুট, পাউরুটিসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। এর বাইরে দেশের দ্রুত বিকাশমান পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতের (অ্যাকোয়া ফিড) অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবে গমের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফলে এক দশক আগেও গমের যে চাহিদা ৪০-৫০ লাখ টনের ঘরে সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ লাফিয়ে ৮৬ লাখ টনে গিয়ে ঠেকেছে।
উৎপাদনে স্থবিরতা বা খরার নেপথ্যে:
চাহিদার এই বিশাল উল্লম্ফনের বিপরীতে গম উৎপাদনের গ্রাফ একেবারেই সমান্তরাল এবং হতাশাজনক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গম উৎপাদন ১০ থেকে ১২ লাখ টনের বৃত্তেই থমকে আছে। গমের এই উৎপাদন ঘাটতি বা স্থবিরতার পেছনে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ
চিহ্নিত করেছেন:
প্রতিক‚ল জলবায়ু ও উষ্ণায়ন: গমের ভালো ফলনের জন্য অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ ও স্থিতিশীল শীতকাল প্রয়োজন। কিন্তু বৈশি^ক উষ্ণায়নের প্রভাবে বাংলাদেশে এখন শীতকালের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যা গম চাষের জন্য চরম প্রতিকুল।
বিকল্প ফসলের আধিপত্য: একই রবি মৌসুমে কৃষক যদি বোরো ধান, আলু, সরিষা বা ভুট্টা চাষ করেন, তবে তিনি গমের চেয়ে আর্থিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হন। ফলে বাণিজ্যিকভাবে গম চাষ কৃষকের কাছে আকর্ষণ হারিয়েছে।
গবেষণা ও বীজের অভাব: পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই, বিশেষ করে তাপসহনশীল উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং মানসম্মত বীজ মাঠপর্যায়ে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।
অর্থনীতিতে আমদানির পাহাড়সম চাপ:
বিশাল এই ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে। বিশ^বাজারে গমের দাম বা জাহাজভাড়ায় সামান্য উত্থান-পতন হলেই দেশের বাজারে আটা-ময়দার দামে আগুন লাগে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ ক্রেতার পকেটে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা হঠাৎ কোনো দেশের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মতো ভ‚-রাজনৈতিক ঘটনাগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে, প্রধান খাদ্যশস্যে এতটা আমদানিনির্ভরতা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে। বিপুল পরিমাণ এই গম আমদানির মূল্য চোকাতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে।
উত্তরণের উপায় কোন পথে?
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতারাতি গমের উৎপাদন ১১ লাখ থেকে ৮৬ লাখ টনে নিয়ে যাওয়া হয়তো বাস্তবসম্মত নয়, তবে এই বিশাল আমদানিনির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব।
এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা বা বরেন্দ্র অঞ্চলের পতিত জমিতে তাপসহনশীল গমের নতুন জাত সম্প্রসারণের জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষককে গম চাষে পুনরায় আগ্রহী করে তুলতে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা, বিনামূল্যে বীজ-সার সহায়তা এবং উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ যে অভাবনীয় সক্ষমতা ও ম্যাজিক দেখিয়েছে, সঠিক নীতি, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করলে গমের বিশাল ঘাটতি কমিয়ে আনাও অসম্ভব নয়।




















