বনভূমি দখল করে পাহাড় কেটে মার্কেট নির্মাণ!

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের আওতাধীন এলাকায় বনভূমি দখল, পাহাড় কেটে মার্কেট নির্মাণ এবং বাড়িঘর ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের জমিতে প্রতিটি বাড়ি নির্মাণের জন্য ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমান।

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ফকিরা বাজারের উত্তর-পশ্চিম দিকে বন বিভাগের জমিতে গড়ে উঠেছে একটি মার্কেট। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় কেটে বন বিভাগের জমিতে এ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু মার্কেট নয়, ওই এলাকায় বনভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বন বিভাগের জমিতে প্রতিটি বাড়ি নির্মাণের জন্য ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিপুল অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ কারা দিয়েছেন, কীভাবে লেনদেন হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো সমঝোতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সরেজমিনে ফকিরা বাজারের উত্তর-পশ্চিম পাশে বন বিভাগের জমিতে নির্মিত মার্কেট দেখা যায়। সেখানে পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগের পাশাপাশি বনভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণ ঘিরে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

ফুলছড়ি রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ আগেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নাপিতখালী বিটের গ্রামপাড়া ও হাতির ডুরি পাহাড় এলাকায় গর্জনগাছ কাটার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই এলাকার বনসম্পদ ও বনভূমি ঘিরে বারবার অভিযোগ ওঠায় বন বিভাগের নজরদারি, দখল প্রতিরোধ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুলছড়ি রেঞ্জ কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় নিজের জন্য একটি ব্যক্তিগত কক্ষ তৈরি করে সেখানে বিশ্রাম নেন ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমান। এতে বিভিন্ন কাজে সেবা নিতে আসা লোকজন অনেক সময় তাঁকে কার্যালয়ে না পেয়ে ফিরে যান বলে দাবি তাঁদের। সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলার এ অভিযোগ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফুলছড়ি রেঞ্জ কার্যালয়ে গিয়ে মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। পরে একাধিক সাংবাদিক বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে তিনি ফোন ধরেননি। প্রায় ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তাঁর পক্ষ থেকে ফিরতি ফোন বা কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ফুলছড়ির সহকারী বনসংরক্ষক শহিদুল হাসান শাকিল বলেন, “আমি নতুন এসেছি। পাহাড় কাটা কিংবা মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেন বলেন, “বনবিধ্বংসী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমার জিরো টলারেন্স। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিভাগীয় বন কর্মকর্তার এ বক্তব্যের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, বন বিভাগের জমিতে কীভাবে মার্কেট নির্মিত হলো এবং বাড়িঘর নির্মাণের জন্য অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের জমির মালিকানা ও দাপ্তরিক নথিপত্র যাচাই, স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন পরীক্ষা এবং কথিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটা বন্ধে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, কীভাবে বন বিভাগের জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠল, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।