সাইকেলে চড়ে ১৯ বছরে ১৯১ দেশ ভ্রমণ বাঙালির

প্রায় দুই দশক ধরে সাইকেল চালিয়ে একের পর এক দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা সোমেন দেবনাথ। তার সঙ্গী একটি সাইকেল আর লক্ষ্য এইচআইভি-এইডস সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরাও তার অন্যতম উদ্দেশ্য।

১৯ বছরে সাইকেলে ২ লাখ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। ঘুরেছেন ১৯১টি দেশ। বিভিন্ন মহাদেশের পথ পেরিয়ে অসুস্থতা ও নানা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েও থেমে থাকেননি।

এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ অভিযাত্রা, পথে নানা প্রতিকূলতা এবং এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে থাকা অনুপ্রেরণার কথা জানিয়েছেন সোমেন।

সোমেন দেবনাথ জানান, ২০০৪ সালের ২৭ মে তার যাত্রা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অভিযানে বের হওয়ার আগে তিনি ভারতের ২৮টি রাজ্য ও পাঁচটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘুরে দেখেন।

এরপর দিল্লিতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। তবে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎকে তিনি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

ওই সাক্ষাতের পর আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরুর জন্য পাঁচটি দেশের ভিসা, ৫০ হাজার রুপি এবং পাঁচটি পরিচয়পত্র পান তিনি।

এশিয়া থেকে ইউরোপ

২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন সোমেন। এর মধ্যে রয়েছে নেপাল, চীন, ভুটান, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা।

এ ছাড়া পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান, ইরান, তুরস্ক, জর্জিয়া ও বুলগেরিয়াতেও সাইকেল চালিয়ে যান তিনি।

২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ইউরোপের ৪৮টি দেশ ঘুরেছেন। এরপর আফ্রিকার ৫৪টি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ১০টি দেশ ভ্রমণ করেন।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকার ১৩টি দেশ সাইকেলে পাড়ি দেন সোমেন। ২০১৮ সালে ঘুরে দেখেন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও মধ্য আমেরিকার কয়েকটি অঞ্চল।

২০১৯ থেকে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি অঙ্গরাজ্য ভ্রমণের পর যান কানাডায়। তার ভ্রমণতালিকায় রয়েছে রাশিয়া ও চীন।

বিভিন্ন মহাদেশ ও ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজের সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন তিনি। তবে এ দীর্ঘ যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। পথে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

করোনায় চীনে আটকা, গুরুতর অসুস্থতা

সোমেন জানান, তার অভিযাত্রার সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি ছিল করোনাভাইরাস মহামারির সময়। ওই সময় চীনে আটকা পড়েন তিনি। সেখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

অসুস্থতার দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, সুস্থ হওয়ার আশায় গরম পানি পান করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এতে তার মুখ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। প্রায় সাত থেকে আট দিন কোনো খাবার খেতে পারেননি।

তবে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর আবারও যাত্রা শুরু করেন।

চীন থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া হয়ে নিউজিল্যান্ডে যান। সেখানে প্রায় এক বছর অবস্থান করেন। পরে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে ভারতের দিকে রওনা হন।

১৪ বছর বয়স থেকেই এইচআইভি সচেতনতায় কাজ

আন্তর্জাতিক সাইকেল অভিযান শুরুর অনেক আগে থেকেই এইচআইভি-এইডস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন সোমেন দেবনাথ।

তিনি জানান, ১৪ বছর বয়সে এইচআইভি-সংক্রান্ত একটি ঘটনা তাকে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর রোগটি সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন এবং এ নিয়ে বিভিন্ন বিষয় জানার চেষ্টা করেন।

১৬ থেকে ২০ বছর বয়সের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালান তিনি। পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এ উদ্যোগ ছড়িয়ে দেন।

আন্তর্জাতিক অভিযাত্রার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এইচআইভি-এইডস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। নতুন প্রজন্মকে রোগটি সম্পর্কে জানানো এবং এ নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভয়, সংকোচ ও নেতিবাচক ধারণা দূর করতে চেয়েছেন তিনি।

অনুপ্রেরণা স্বামী বিবেকানন্দ ও একটি বই

সাইকেলে বিশ্বভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে দুটি বিষয় বড় ভূমিকা রেখেছে সোমেনের জীবনে। একটি স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ, অন্যটি আরেক ভ্রমণকারী বিমল মুখার্জির লেখা একটি বই।

সোমেন বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা তাকে বিশ্ব ঘুরে দেখার এবং অন্য দেশের মানুষের কাছে ভারতীয় সংস্কৃতির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

এ ছাড়া বিমল মুখার্জির লেখা দো চাক্কা দুনিয়া (দুই চাকায় বিশ্ব) বইটিও তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

১৯২৬ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন বিমল মুখার্জি। তার অভিজ্ঞতার কথা পড়ে নিজের সাইকেল অভিযাত্রা শুরুর অনুপ্রেরণা পান সোমেন।

প্রতিদিন ৭০-৮০ কিলোমিটার সাইকেল চালান

সোমেন জানান, প্রতিদিন সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার সাইকেল চালান তিনি। তবে কখনো কখনো এক দিনে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দেন।

তবে এখন আগের তুলনায় ধীরে চলার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিন সাইকেল চালানোর কারণে পায়ে ব্যথা হচ্ছে, যা তার চলার গতিতে প্রভাব ফেলেছে।

দীর্ঘদিনের এই পথচলায় অল্প কিছু জিনিস নিয়ে জীবনযাপন করতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। সাইকেল ও সঙ্গে থাকা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রই এখন তার ঘরবাড়ি।

সোমেন বলেন, ‘আমার প্রয়োজনীয় সব কিছুই সঙ্গে আছে। আমার ছোট্ট ভ্রাম্যমাণ বাড়িটি সঙ্গে নিয়েই চলি। সেটিই আমার ঘর।’

তার কাছে সাইকেল কেবল যাতায়াতের বাহন নয়। এটি বিশ্বের মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, ভাবনার আদান-প্রদান এবং এক কিলোমিটার করে এগিয়ে নিজের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম।