ছেলের মরদেহ উদ্ধার নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানালেন বাবা

‘আম্মু আমি আসছি’ শেষ মেসেজ পাঠিয়েছিলেন তাহসিফ

রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া তাহসিফ সাউরির নিখোঁজ হওয়ার আগের দিনের ঘটনা ও পরে কি ঘটেছে তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে তিনি জানান, গত ২৭ অক্টোবর সারাদিন পরিবারের সদস্যদের জন্য শপিং করেছিলেন তাহসিফ। সন্ধ্যার পর দীপ নামের এক জুনিয়রের ডাকে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি তিনি।

তাহসিফের বাবা আরও জানান, শৃঙ্খলাজনিত কারণে তাহসিফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। ওই সময়ে আরও কয়েকজনকেও বরখাস্ত করা হয়। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাহসিফ।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন সারাদিন মাকে সঙ্গে নিয়ে বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। সন্ধ্যার পর দীপ নামের এক জুনিয়র ছোট ভাইয়ের ডাকে নিচে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে ‘আম্মু আমি আসছি’ লিখে একটি মেসেজ পাঠিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ভোর সোয়া ৫টার দিকে পুলিশের দেওয়া তথ্যে ছেলের মরদেহের সন্ধান পান তারা।

তাহসিফের বাবা আরও জানান, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তার ছেলে এর আগে কখনো যাননি।

এদিকে, তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে মামলা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে ঢাকা রেঞ্জের নৌ পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট।

পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ সাউরি। বুধবার জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বর থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় নৌ-পুলিশ। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার এক আত্মীয়কে খবর দেওয়ার পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফের পরনে সাদা পাজামা ও কালো জামা ছিল। তার হাতে একটি ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তবে তার মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজে করে দেশত্যাগের ভিডিও তাহসিফ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ নিশ্চিত করেনি।

আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে: তাহসিফের বোনের ক্ষোভ

নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির নিথর দেহ। মঙ্গলবার রাত থেকে নিখোঁজ থাকার পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। তবে এটিকে কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু বা সাধারণ দুর্ঘটনা মানতে নারাজ নিহতের পরিবার; ঘটনাটিকে একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করেছেন তার স্বজনেরা।

তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন ও বিস্ফোরক পোস্ট দেন তার খালাতো বোন মোশফেকা জাহান। সেখানে তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের গোপন ভিডিও শেয়ার করার কারণেই তাহসিফকে নির্মম পরিণতির শিকার হতে হয়েছে।

ফেসবুক পোস্টে মোশফেকা জাহান লেখেন, আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে। কী দোষ ছিল তার? হাসিনার পালানোর ভিডিও শেয়ার করা? যেটি তিনি নিজেও ধারণ করেননি, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে শুধু শেয়ার করেছিলেন; হয়তো তার সহকর্মীদের কেউ তা ধারণ করেছিলেন। তাকে অন্যায়ভাবে অবসরে পাঠানো হলো, দিনের পর দিন মানসিক নির্যাতন চালানো হলো, তবুও তাদের শান্তি হলো না। শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলতে হলো তাকে?

তিনি আরও অভিযোগ করেন, চাকরি থেকে অব্যাহতির পরও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন নিয়মিত তাহসিফকে অনুসরণ করত বলে তাহসিফ নিজেই তাঁকে জানিয়েছিলেন। একজন সুস্থ মানুষকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশপ্রেমিক হওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে সক্রিয় থাকার কারণেই কি এমন চরম মূল্য দিতে হলো?

মোশফেকা জাহান ফেসবুকে আরেকটি পোষ্টে তার অনুমতি না নিয়ে তার নাম দিয়ে কোন নিউজ না কারার অনুরোধ জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঐতিহাসিক দৃশ্যটি জনসমক্ষে ফাঁসের পেছনে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির নাম দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়ে আসছিল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। অন্যদিকে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত বছরের ৪ আগস্ট জানিয়েছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক অভিযোগ ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় তাহসিফকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।

নৌপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির ভাসমান লাশ উদ্ধার করে।

লাশ উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো পাঞ্জাবি। হাতে থাকা হাতঘড়ি এবং পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে দ্রুতই তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ। পরবর্তীতে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

রহস্যজনক এই মৃত্যুর পেছনে কোনো নাশকতা বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছে।