অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পরেও

কলকাতা নিউমার্কেট এলাকার ৮০০ রুপির ঘর এখন ৩ হাজার

কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত নিউমার্কেটে গত ১৯ আগস্ট একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই দুর্ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সংকট কাটেনি।

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। এই উৎসবের আগে প্রতিবছর বাড়তি ব্যবসার আশায় থাকেন নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা। দুর্গাপূজার মৌসুমে বাংলাদেশি পর্যটকদের উপস্থিতিতে এ সময় নিউমার্কেট ও এর আশপাশের এলাকা জমজমাট হয়ে ওঠে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

হোটেল বন্ধ থাকায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা জানেন না হোটেল ব্যবসায়ী, পরিবহন ব্যবসায়ী ও মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বন্ধ হোটেল, বিপাকে বাংলাদেশি পর্যটকেরা

অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের নির্দেশে নিউমার্কেট চত্বরের প্রায় সব হোটেল, লজ ও গেস্ট হাউস বন্ধ রয়েছে। এক মাস পেরিয়ে গেলেও এসব আবাসিক প্রতিষ্ঠান কবে খুলবে, তা স্পষ্ট নয়।

তবে হোটেল বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশি পর্যটকদের কলকাতায় আসা কমেনি। প্রতিদিনই ব্যবসা, পর্যটন ও চিকিৎসার কাজে বাংলাদেশ থেকে পর্যটকেরা কলকাতায় যাচ্ছেন।

তবে নিউমার্কেট এলাকায় হোটেল না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন এসব পর্যটক। বাংলাদেশি গণমাধ্যমে হোটেল সংকটের খবর প্রকাশিত হওয়ায় অনেক পর্যটক এখন নিউমার্কেট এড়িয়ে আশপাশের এলাকায় থাকছেন।

তারা পার্ক স্ট্রিট ও শিয়ালদহ এলাকার হোটেল ও গেস্ট হাউজে উঠছেন। আর যারা নিউমার্কেট এলাকায় থাকতে চাইছেন, তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।

৮০০ রুপির ঘর এখন ৩ হাজার

চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা থেকে কলকাতায় গেছেন মাসুদ। তিনি বলেন, ‘সারারাত ভ্রমণ করে কলকাতায় এসেছি। এখন পর্যন্ত দুটি হোটেল দেখেছি। কিন্তু ভাড়া আমাদের বাজেটের বাইরে। আগে যে হোটেলে ৮০০ রুপিতেও থাকা যেত, এখন সেই হোটেল তিন হাজার রুপি চাইছে।’

বাংলাদেশি পর্যটকেরা কলকাতায় এলে সাধারণত নিউমার্কেট এলাকায় থাকতে পছন্দ করেন। ফলে তাদের থাকা, খাওয়া, কেনাকাটা ও যাতায়াতকে কেন্দ্র করে এলাকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লাভবান হতো।

হোটেল বন্ধ থাকায় এখন অধিকাংশ বাংলাদেশি পর্যটক নিউমার্কেটের বাইরে পার্ক স্ট্রিট ও শিয়ালদহ এলাকায় থাকছেন। এতে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

কমেছে ব্যবসা, বাড়ছে উদ্বেগ

হোটেল ব্যবসার পাশাপাশি পর্যটকনির্ভর অন্যান্য ব্যবসাতেও মন্দা দেখা দিয়েছে। পর্যটকেরা নিউমার্কেটে এলেও আগের মতো সময় কাটাচ্ছেন না। ফলে সব মিলিয়ে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হায়দার বলেন, আগে প্রতিদিন দেড় হাজার থেকে দুই হাজার রুপি আয় হতো। এখন ২০০ রুপি আয় করতেও কষ্ট হচ্ছে। তার ভাষ্য, পরিস্থিতি খুবই খারাপ। ব্যবসায়ীদের মধ্যে একধরনের ভয় কাজ করছে।

ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী খান বলেন, ‘পর্যটকেরা আগের মতোই আসছেন। কিন্তু আমরা তাদের ঠিকমতো সেবা দিতে পারছি না। কেবল একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

হায়দার আলী খান আরও বলেন, পুলিশ ও কলকাতা পৌরসভার কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। যেসব আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলনামূলক কম, সেগুলো কিছুটা ছাড় পেতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।

পূজার আগে স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা

মার্কুইস স্ট্রিটে অবস্থিত আর এন টেগোর হাসপাতালের অধীন একটি আউটলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাফর খান বলেন, গত এক মাসেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

তিনি বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় হোটেলে থাকার জন্য পর্যটকেরা আসছেন, কিন্তু তারা ঘর পাচ্ছেন না। পূজার আগে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

আগুনের পর বন্ধ শত শত হোটেল

২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট কলকাতার নিউমার্কেট চত্বরের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় নয়জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক।

এরপর অগ্নিনিরাপত্তাবিধি না মানা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে কঠোর পদক্ষেপ নেয় রাজ্য সরকার। কলকাতা পৌরসভার আওতাধীন প্রায় ৯০০ আবাসিক হোটেল, লজ ও গেস্ট হাউস বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরমধ্যে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকাতেই রয়েছে শতাধিক হোটেল।

অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পরও এসব হোটেলের অনেকগুলোর দরজায় তালা ঝুলছে। ফলে দুর্গাপূজার আগে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসা কতটা স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র: জাগোনিউজ