খাগড়াছড়ির পাহাড়ি আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব শুরু

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ৯টি উপজেলা চাকমা, মারমা, মগ, ত্রিপুরা, রাখাইন, তংচগ্যা, অহমিয়া, গোরখা, সাওতাল, মনিপুরি পাহাড়ি আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু-সাংগ্রাইং-বৈসু-বিষু, বিহু, চাংক্রান, সংক্রান, বাহা পরব, পাতা ও বাংলা নববর্ষ বরন শুরু হয়েছে।
পুরোনো বছরের সকল দুঃখ-গøানি মুছে গিয়ে নতুন বছরের সুখ-শান্তি ও মঙ্গল কামনায় নদীতে ফুল অর্পণের মধ্য দিয়ে ১২ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। মারমা, মগ, রাখাাইন ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়ে, ধ-খেলা উদ্ভোধন ও শুভেচ্ছা র্যালী শোভা যাত্রা বের করে ১৩ই এপিল আনুষ্ঠানিক সাংগ্রাইং শুরু হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি আদিবাসীদের জাতিসত্তাসমূহের জাতীয় ঐতিহ্যবাহী তিন পার্বত্য জেলায় প্রধান সামাজিক উৎসব। তবে বেশ করে কদিন আগে থেকেই উৎসবকে ঘিরে চলছে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রাসহ নানান আয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাসমূহ নিজেদের প্রথাগত রীতি-নীতি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন নামে এই উৎসব পালন করে থাকে। ত্রিপুরারা “বৈসুক/বৈসু”, মারমা-মগ-রাখাইনরা “সাংগ্রাইং”, চাকমারা “বিঝু”, তঞ্চঙ্গ্যারা “বিষু”, গুর্খা-অহোমিরা “বিহু”, খেয়াংরা “সাংলান’, খুমিরা “সাংক্রাই”, চাকরা “সাংগ্রাইং”, ¤্রােরা “চাংক্রান”, সান্তালরা “বাহা পরব”, সাওতালরা ”পাতা” নামে এবং অন্যান্য জাতিসত্তাগুলোও নিজস্ব নামে উৎসবটি পালন করে।
তবে কয়েকটি আদিকাসী জাতিসত্তার উৎসবের নামের আদ্যক্ষরের সম্মিলনে উৎসবটি ত্রিপুরাদের-বৈসু, মারামাদের সাংগ্রাইং, চাকমাদের বিজু “বৈ-সা-বি” বা “বৈসাবি” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী দিপেন দেওয়ান ঘোষনাকৃত আদিবাসীদের যার যার ভাষায় সম্প্রদায় ভিত্তিক মাতৃভাষা নামে অভিহিত করা আহবান জানান। যা জাতিসত্তাগুলোর ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এ উৎসবের মূল চেতনাই হচ্ছে জাতীয় ঐক্য-সংহতি জোরদার করা।
ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবে অতীতের কিছু নিয়ম-কানুন বাতিল হয়ে গেলেও নতুনভাবে উৎসবের শুরুর দিন কিংবা তার আগে পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও জমায়েত সহকারে নদীতে ফুল নিবেদনের রীতি সংযোজন করা হয়েছে। এতে পাহাড়ি আদিবাসীরা সম্মিলিতভাবে স্ব-স্ব জাতীয় পোশাক পরিধান করে, নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তুলে ধরে শোভাযাত্রা, জলকেলি উৎসব(রি-আকজা) ও নদীতে ফুল নিবেদন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকেন।
বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে ও উৎসব উদযাপন কমিটি গঠন করে এ ধরনের শোভাযাত্রা ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
নানান বৈচিত্র্যময় এই উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ি আদিবাসী জাতিসত্তাগুলো নিজেদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ধারণ করে সামাজিক মিলনের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগ্রত করে। পুরাতন বছরের সকল গøানি মুছে দিয়ে সকল মানব জাতি ও প্রাণীকূল নিরাপদে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকুক– এমন ভাবমানসই এই উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এখানে ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা স¤প্রদায়ের উৎসব নিয়ে সংক্ষিপ্তকারে তুলে ধরা হলো ত্রিপুরাদের বৈসু/বৈসুক: ত্রিপুরারা উৎসবের প্রথম দিনকে হারি বৈসু, দ্বিতীয় দিনকে বৈসুমা বা বৈসুকমা এবং তৃতীয় দিন অর্থাৎ বাংলা নববর্ষ প্রথম দিনটিকে বিসিকাতাল বলে।
হারি বৈসুর দিন নানান ধরণের ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়ে ঘরগুলোকে সুবাসিত করে তোলা হয়। ঘরের গৃহপালিত প্রাণি গরু-ছাগলকে ফুলের মালা পরানো হয়।
এরপর কিশোর কিশোরীরা দলবেঁধে ছড়া ও গংগামা নদীতে গোসল করে ফুল দিয়ে মঙ্গল কামনা করে বাড়িতে ফিরে মাইলোংমা(ল²ী) আসনে ফুল-ধূপবাতি দিয়ে পুজা সম্পন্ন করে থাকে। বিশেষ করে বাড়ির মায়েরাই ফুল দিয়ে গঙ্গা পুজা করে থাকে।
বৈসুমা দিনে ত্রিপুরারা তাদের বাড়িতে অতিথিদের বিভিন্ন সবজির মিশ্রণে রান্না করা পাচন, পিঠাসহ নানা খাদ্য-পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে।
উৎসবের শেষ দিনে আগের দুইদিনের মতো অন্যান্য অনুষ্ঠান ছাড়াও এ দিনে বাড়ির মাতা-পিতা, দাদা-দাদীদের নদী থেকে জল তুলে এনে স্নান করানো হয়। নতুন কাপড় দান করা হয়। এদিন ত্রিপুরাদের প্রতিটি বাড়িতে পিঠা-পায়েস ছাড়াও মাছ-মাংসের আয়োজন চলে। বিশেষ করে এই দিনেই বড়োদের পানাহারের উৎসব চলে।
বৈসু উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো তাঁদের প্রধান দেবতা গরিয়া দেবের খেরাবই নৃত্য। গরিয়া পূজায় যাঁরা নাচে তাঁদেরকে বলা হয় খেরাবই। গরিয়া দেবের প্রতিমূর্তিকে বহন করে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় নৃত্য পরিবেশন করে খেরবাই দল। দেখানো হয় ত্রিপুরাদের জীবন-জীবিকার উপর খেলা ও অভিনয়।
মারমা-মগ-রাখাইনদের সাংগ্রাইং: মারমারা চারদিন সাংগ্রাই উৎসব পালন করে থাকে। সাংগ্রাইংয়ের ১ম দিনকে পেইংছুয়ে:(১৩ই এপ্রিল), ২য় দিনকে আক্যেই(মুল সাংগ্রাইং ১৪ই এপ্রিল), ৩য় দিনকে আতাদা(১৫ই এপ্রিল) ও ৪র্থ দিনকে আপ্যেইং(১৬ই এপ্রিল) হিসেবে পালন করে।
সাংগ্রাইংকে ঘিরে ঐতিহ্যবাহী জল কেলি উৎসব(রি-আকজা)পানি খেলার আয়োজন করা হয়। এই পানি খেলার মাধ্যমে তারা পুরানো বছররের গøানি মুছে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী ‘ধ’ খেলারও আয়োজন করা হয়ে থাকে।
উৎসবের প্রথম দিন পাড়ার যুবক যুবতীরা নদী থেকে পানি তুলে প্রবীণ বৃদ্ধদের গোসল করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। ঘরে ঘরে গিয়ে গৃহপালিত প্রাণি মোরক-মুরগীকে চাউল ছিটিয়ে খাওয়াানো হয়। বৌদ্ধ বিহার বা মন্দিরে গিয়ে দল বেঁধে বুদ্ধ মূর্তিগুলোকে গোসল করানো হয়।
উৎসবের ২য় দিনে প্রত্যেকের বাড়িতে নানা মূখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়। এতে পাচন, পানীয়সহ নানাবিদ খাদ্য পরিবেশন করা হয়।
সাংগ্রাই উৎসবকে ঘিরে মন্দির বা ক্যায়াং ঘর ভালভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। দায়ক-দায়িকারা টানা তিনদিন অবস্থান নিয়ে ধর্মীয় দীক্ষায অষ্টম শীল গ্রহনে অভিভূত হয়ে বুদ্ধ মূতির সামনে ফুল রেখে বুদ্ধ পুজা ও মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রণাম করে। পাড়ার লোকজন ক্যায়াং ঘরে গুরু ভিক্ষু, শ্রমণ, সাধু-সাধুমাদের উদ্দেশ্যে ছোয়াইং প্রদান করে।
চন্দনের পানি, দুধ ও ডাবের পানি দিয়ে বুদ্ধ মূর্তিকে স্নান করানোর মধ্য দিয়ে সূচনা হয় এর নতুন বছর। এদিন তরুণ-তরুণীরা নতুন বছরকে বরণ করতে দলে দলে এসে জলকেলি উৎসব(রি-আকজা)পানি খেলায় মেতে উঠে।
চাকমাদের বিঝু/বিজু: চাকমারা ১ম দিনকে ‘ফুল বিঝু’ (১২ই এপ্রিল), ২য় দিনকে ‘মূল বিঝু/মুল বিজু’(১৩ই এপ্রিল) ও ৩য় দিন(১৪ই এপ্রিল) “গোজ্জেপোজ্জে” বিঝু(নতুন বছরকে বরণ) হিসেবে পালন করে থাকে।
উৎসবের প্রথম দিনে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে। ঘরবাড়ি ও আঙ্গিনা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা ও ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়। গৃহপালিত পশুদের(গরু, ছাগল) পরিসেবা দেওয়া হয় ফুলের মালা।
এরপর পাহাড়ি ছড়া, ঝর্ণা বা নদীতে গিয়ে গোসল করে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল দিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়। অনেকে পরবর্তী দিনে(মুল বিঝুর) ’পাজন’ রান্নার জন্য জঙ্গলে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত নানা সবজিজাত তরিতরকারি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে(এখন অবশ্য সবকিছু বাজারে পাওয়া যায়)।
উৎসবের ২য় দিনে প্রত্যেকের বাড়িতে নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়। এতে কমপক্ষে ৩৭টি প্রকার বা তার বেশী আনাসপাতি দিযে রান্না করা ‘পাচন/পাজন’সহ নানা খাদ্য-পানীয় পরিবেশন করা হয়। নানা বয়সি লোকজন সারাদিন দল বেঁধে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। উল্লেখ্য, এদিন ভোরে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পালিত মুরগীদের খাদ্য দেয়ার রীতি প্রচালিত থাকলেও বর্তমানে তা আর তেমন দেখা যায় না।
৩য় দিনে মন্দিরে গিয়ে নতুন বছরের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালন করা হয়। এই দিন অনেকে পাড়ার বয়স্ক মুরব্বীদের বাড়িতে ডেকে উন্নত খাবাবের আয়োজন করেন। আর অনেকে উৎসবের তিন দিনই(অনেকে ক্ষেত্রে ৭দিন) মন্দির, বাড়ি আঙ্গিনা, নদীর ঘাট, বটবৃক্ষ বা সবুজ গাছের নীচে এবং গোয়াল ঘরে বিভিন্ন দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালান।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অন্যান্য পাহাড়ি আদিবাসী জাতিসত্তাগুলোও একইভাবে যার যার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতি অনুসারে উৎসবটি পালন করে থাকে। এর মধ্যে তঞ্চঙ্গ্যাদের ঐতিহ্যবাহী ঘিলাখেলা প্রধান আকর্ষণ হয়ে থাকে।





























