খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের আধাবেলা অবরোধ শান্তিপূর্ন ভাবে পালিত

পার্বত্য জেলার টুরিজম স্পর্ট সাজেক থমথমে ঘটানাকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের আধাবেলা অবরোধ শান্তিপূর্ন ভাবে পালিত হয়েছে। চতুর্থ দফা ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের ডাকে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি সকাল ৫টা থেকে শুরু করে দুপুর ১২টায় শেষ হয়েছে।
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চলা আধাবেলা অবরোধে যান চলাচল বন্ধ ছিল। খাগড়াছড়ি ও রাংগামাটি চলছে না যানবাহন, শহর এলাকায় খোলা থাকলেও আংশিক বন্ধ রয়েছে অলিগলি দোকানপাট। অবরোধের কারণে দূরপাল্লার যানবাহন চলচল বন্ধ রয়েছে। খাগড়াছড়ি থেকে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি।
প্রত্যক্ষ সরেজমিন দেখা যায়, সড়কেও মানুষের যাতায়াত কম। বাসিন্দাদের মধ্যে যাঁরা বের হয়েছেন তাঁদের হেঁটে গন্তব্যের দিকে যেতে দেখা যায়। যানবাহন চলাচল না করায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের। সড়কে যান চলাচল বন্ধ। তাই হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে একটি পরিবার যাচ্ছে।
শনিবার(২৪শে অক্টোবর ২০২৬) সকাল ৫টা থেকে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার ও গাছের গুড়িতে আগুন জ্বালিয়ে পিকেটাররা অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেছেন।
অলিগলি সড়কে টায়ার ও গাছের গুড়িতে আগুন জ্বালিয়ে এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন পিকেটাররা।
রাঙামাটির সাজেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ ও ঘরবাড়ি-দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ অবরোধ কর্মসূচি চলছে বলে সংগঠনির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অবরোধকারীরা খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী ব্রিজ-ফায়ার সার্ভিস ও স্বনিভর-পেরাছড়া এলাকা, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কৃষি গবেষণা এলাকা এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের গুইমারা এলাকায়, পানছড়ি, রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের বেতবুনিয়া এলাকায়, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপছড়ি, কুদুকছড়ি বেতছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে, দীঘিনালা-সাজেক সড়কের জোড়াব্রীজ এলাকা, সাজেক পর্যটন সড়কের বাঘাইহাট ১০নাম্বার, মাচলং ১৪কিলোসহ বিভিন্ন সড়ক টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। এছাড়া, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপমারা এলাকায় গাছ কেটে সড়ক আটকে দেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়ি রাঙামাটির কুদুকছড়িতে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অত্যন্ত করাভাবে আধাবেলা অবরোধ পালিত হয়েছে। ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা আধাবেলা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি রাঙামাটির কুদুকছড়িতে হয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে কুদুকছড়ি এলাকায় এ অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তবে অবরোধের কারণে যান চলাচল ও জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে জানা গেছে। রামগড়ে ছাত্র জনতা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে অবরোধ হয়েছে। তবে ছাত্র জনতা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা আধাবেলা অবরোধ শান্তিপুর্ন পালিত হয়েছে। খাগড়াছড়ি সদরের ফায়ার সার্ভিস এলাকায় সড়কে আগুন জ্বালিয়েছে পিকেটাররা।
রাঙামাটির কুদুকছড়িতে অবরোধের সমর্থনে সড়কে আগুন জ্বালানো হয়েছে। নান্যাচরে অবরোধের সমর্থনে সড়কে টায়ার জ্বালানো হয়েছে। নান্যাচরের তৈচাকমা পাড়া এলাকায় সড়কে গাছের গুড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ পালন করেছে পিকেটারারা।
খাগড়াছড়ি শহরের ফায়ার সার্ভিস এলাকায় পিকেটাররা টায়ার জ্বালিয়ে পুন:বার অবরোধ পালন শুরু করলে সেনাবাহিনী তাতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে বলে জানা গেছে। তবে পিকেটাররা সেনাবাহিনী দাওয়া খেয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত বড় কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
খাগড়াছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো: কায় কিসলু বলেন, “ঢাকা থেকে আসা রাতের বাসগুলো পুলিশি পাহারায় খাগড়াছড়ি নিয়ে আসা হয়েছে। কয়েকটি গাড়ি ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি ঢুকতে দেরি হওয়ায় সেগুলো রামগড় আছে, নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দুপুর ১২টার পর খাগড়াছড়ি আসতে।” এখন পর্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি শান্ত আছে বলে তিনি জানান।
এদিকে বাঘাইছড়ি মারিশ্যা ১১কিলো রাঙ্গামাটির সাজেকে সড়ক অবরোধকারী আন্দোলনরত জনতার ওপর সেনাবাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণের ঘটনাকে পাহাড়ে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নগ্ন দমন-পীড়নের প্রতিচ্ছবি বলে মন্তব্য করেছে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট। একই সাথে সাজেকে সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট নিরসন এবং হামলার সঙ্গে জড়িত সেনা সদস্যদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর) রাঙ্গামাটির সাজেকে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানান গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
বিবৃতিতে ছাত্র জোটের নেতারা অভিযোগ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘকাল ধরেই রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়ি জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ‘সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী’ তকমা লাগিয়ে সেনাবাহিনী প্রতিনিয়ত নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
সা¤প্রতিক সময়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে জোট নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছিলেন‘ পাহাড়ে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়’। দেশ রক্ষা ও নাগরিক সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর এমন বক্তব্য কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের মন্তব্য মূলত পাহাড়ি জনগণের ওপর চলমান নিপীড়নকে প্রকাশ্যে আইনি বৈধতা দেওয়ারই সামিল। যার ফলে খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতায় সাজেকেও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালানো সম্ভব হয়েছে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরও দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী নিজেদের স্বার্থে ও গণবিরোধী কর্মকান্ড জায়েজ করতে মদদপুষ্ট সশস্ত্র প্রক্সি গ্রæুপ তৈরি করে পাহাড়ে অরাজকতা টিকিয়ে রাখছে। সাজেকবাসী জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সেনাপোষ্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষকে তল্লাশি ও হয়রানি বন্ধের ৩দফা দাবিতে পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি পালন করছিল। কিন্তু সেই কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী চড়াও হয়ে লাঠিচার্জ ও এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। এ ববর হামলায় অন্তত ৬০জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নেতারা বলেন, সাজেকের উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের ওপর এ হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশে বর্তমানে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট পাহাড়ি জনগণের এই ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে। একই সাথে অবিলম্বে এ কৃত্রিম সংকট বন্ধে সরকারকে দ্রæুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহŸান জানাচ্ছে।
বিবৃতিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছেন-গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট ও সভাপতি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল সভাপতি ছায়েদুল হক নিশান, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি তামজিদ হায়দার চঞ্চল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী সভাপতি শাহরিয়ার খন্দকার আলিফ, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) সভাপতি সমর চাকমা এবং বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন সহ-সভাপতি নাঈম উদ্দীন।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর) সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ চলাকালে সেনাবাহিনী হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে ওই দিনই ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় এই আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয়।
আরো উল্লেখ্য, গত ২২শে অক্টোবর রাঙামাটির সাজেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ ৩দফা বাস্তবায়নের দাবিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের তৃতীয় দফা শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকালে সেনাবাহিনী হামলা চালায়।
এ সময় তারা বেপরোয়া লাঠিচার্জ, গুলিবর্ষণ ও ঘরবাড়ি ভাংচুর করে। এতে ৭০জনের অধিক নারী-পুরুষ আহত হন।
অপরদিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে দুটি সংগঠনের ডাকা অবরোধে কারণে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ‘গোলাগুলির’ ঘটনার পর থেকে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এলাকায়। বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ দোকানপাট। গত শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার বাঘাইহাট বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বেশির ভাগ দোকানপাটও বন্ধ। কয়েকটি দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই। বাজার প্রায় লোকশূন্য। যদিও স্বাভাবিক সময়ে ক্রেতা-বিক্রেতায় মুখর থাকে বাজারটি।
সাজেক যাওয়ার বাঘাইহাট স্টেশনের লাইনম্যান মো: জসিম বলেন, অবরোধকারীরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং করছেন। যার কারণে খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-সাজেক সড়কে স্থানীয় যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, ‘সাজেক বর্তমানে একেবারেই পর্যটকশূন্য। আগের সব বুকিং বাতিল হয়ে গেছে। সাজেকে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করছে না।’
সাজেক অবরোধ চলছে গণ অধিকার রক্ষা কমিটির ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি সংগঠনের ডাকে। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, ‘সাজেকে সড়ক অবরোধ এখনো চলমান। সাজেক ১০নম্বর ও ১৪কিলোমিটার এলাকায় আমাদের পিকেটিং চলছে।’
পার্বত্য রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার(ইউএনও) সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, সাজেকে গতকাল যে রকম ঘটনা ঘটেছিল, রাঙামাটি সে রকম পরিস্থিতি নেই। স্বাভাবিক সাধারন মানুষ চলাচল করছে। আমরা এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’
সংগঠন দুটির তৃতীয় দফায় ডাকা অবরোধের প্রথম দিনেই গতকাল বৃহস্পতিবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গতকাল সকাল থেকেই সাজেকের উজো বাজার এলাকায় অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়।
অবরোধকারীরা পর্যটকবাহী গাড়িবহর চলাচলে বাধা দেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দিলে গাড়িবহর এগিয়ে যায়। এরপর বেলা ১১টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ মিথ্যা নাটক ও নিজের গুলি করে অপরকে দায় দেওয়া অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।
এ উত্তেজনার মধ্যেই গতকাল বেলা একটার দিকে সাজেকে আটকে পড়া ২হাজার ৯৩৩পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফেরার পথে অবরোধ ও গোলাগুলির ঘটনায় তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।
অবরোধের সমর্থনে খাগড়াছড়িতে পিসিপির প্রচার মিছিল:-
সাজেকে শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে ও সাজেবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের ডাকা শনিবার (২৪শে অক্টোবর ২০২৬) রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে খাগড়াছড়িতে প্রচার মিছিল করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), খাগড়াছড়ি জেলা শাখা। দ
গত শুক্রবার(২৩শে অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যা ৬টায় খাগড়াছড়ি ফায়ার সার্ভিস এলাকা থেকে প্রচার মিছিলটি শুরু হয়ে বার্স টার্মিনাল গিয়ে মিছিল থেকে সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানানো হয় এবং শনিবার আধাবেলা শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি সফল করার আহŸান জানানো হয়।
সাজেক চালুর দাবিতে ৪৮ঘণ্টার আল্টিমেটাম, পাল্টা সড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি:-
পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে চলমান সড়ক অবরোধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন খাগড়াছড়ির পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন নেতারা। আগামী ৪৮ঘণ্টার মধ্যে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দ্রæুত অবরোধ প্রত্যাহার না হলে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
শুক্রবার (২৩শে অক্টোবর) বিকেলে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ গেটের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মিছিলটি শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের দ্ব›েদ্ধ বারবার বন্ধ হয়ে পড়ছে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম। এতে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে, যা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রটির ভাবমূতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
খাগড়াছড়ি মাহিন্দ্র যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, “পর্যটন এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। পর্যটন বন্ধ হলে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। কয়েক দিন পরপর এমন অবরোধ কর্মসূচির কারণে আমরা ব্যাপকভাবে ক্ষডুগ্রস্ত হচ্ছি। দ্রæুত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দিতে হবে।
খাগড়াছড়ি ইকো ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের(ইটাব) সদস্য উজ্জ্বল দে বলেন, “সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের মতো একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অবরোধের ডাক দিচ্ছে। দুই আঞ্চলিক সংগঠনের বিরোধের জেরে আমাদের ব্যবসায়ীরা বলির পাঁঠা হচ্ছেন। বারবার আন্দোলন কর্মসূচির কারণে পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কারণে পর্যটকেরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। দেশের দ্বিতীয় জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক অবিলম্বে খুলে দিতে হবে। দ্রæুত অবরোধ প্রত্যাহার না করলে আমরা আরও বড় আন্দোলনের কর্মসূচি দেব।”
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ, জিপ মালিক সমিতির সভাপতি মফিজুর রহমান, ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মীর হোসেন, সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি মো; জসীম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন এবং পরিবহন শ্রমিক নেতা মো: মাসুমসহ অন্যরা।
বক্তারা বলেন, পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন পর্যটননির্ভর অসংখ্য মানুষও। তাই পর্যটনশিল্পের স্বার্থে অবিলম্বে অবরোধ প্রত্যাহার করে সাজেকে স্বাভাবিক পর্যটন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। তিন দফা দাবিতে শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো সাজেকে সড়ক অবরোধ চলেছে।
জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ২২ অক্টোবর থেকে এ কর্মসূচি পালন করছে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। সংগঠন দুটি ইউপিডিএফ-সমর্থিত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অবরোধের দ্বিতীয় দিনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সকাল থেকে অবরোধের সমর্থনে কোনো মিছিল বা পিকেটিংও দেখা যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ৪৮ঘণ্টার মধ্যে সাজেক খুলে দেওয়ার দাবি ও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিতে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে পর্যটন খাতের ক্ষতি বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
এর আগে ১৫ই অক্টোবর সকাল ছয়টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে দ্বিতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেন সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। বাঘাইহাটের ১০নম্বর এলাকা, গঙ্গারাম সেতু ও মাচলঙের ১৪কিলোসহ কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধ করা হয়। এতে সাজেকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(পিসিজেএসএস–-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। ১১ই অক্টোবর একই দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরা। সেদিন বিকেলে প্রশাসনের আশ্বাসে ৪৮ঘণ্টার জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এরপর গতকাল বুধবার যৌথ বিবৃতিতে দ্বিতীয় দফায় অবরোধের ঘোষণা দেন দুই সংগঠনের নেতারা।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, সাজেক এলাকায় পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিসিজেএসএস)। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ইউপিডিএফের চাপে সংগঠন দুটি অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অবরোধের কারণে গত রোববার পর্যটকবাহী যানবাহন সাজেকে আটকা পড়েছিল। ওই দিন সন্ধ্যায় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণায় ১৫ই অক্টোবর এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
গত বৃহষ্পতিবার (২২শে অক্টোবর) অবরোধকারীদের ওপর হামলার পর সেনাবাহিনীর ‘গোলাগুলির’ নাটক, জনমনে আতঙ্ক, সাজেকের উজোবাজারে এক নারীর ওপর সেনাবাহিনীর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ। তবে আইএসপিআর জানিয়েছে, সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।
পুলিশ বলছে, সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় সেনা-পুলিশসহ অন্তত: ৬জন আহত হয়েছে।
রাঙামাটির সাজেকের উজোবাজার এলাকায় সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালনকারী জনতার ওপর হামলা, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণের পর সেনাবাহিনী কথিত ‘গোলাগুলির’ নাটক সাজিয়ে জনগণকে ভীতি সন্ত্রস্ত করে রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ঘটনার বিবরনে জানা যায়, তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর ২০২৬) সকাল থেকে তৃতীয় দফা সড়ক অবরোধ পালন করছিল উক্ত দ্ংুগঠনের নেতা-কর্মীসহ এলাকার সাধারণ জনগণ। তারা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে থাকে। পরে তারা উজোবাজারে গিয়ে সড়কের ওপর বসে পড়ে এবং সাজেক পর্যটন সড়কটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সাজেক ভ্যালী পর্যটনে আটকে পড়া পর্যটকদের গাড়ি বহর নিয়ে উজোবাজারে উপস্থিত হয়। অবরোধকারীরা সড়কটি ছেড়ে না দিলে এক পর্যায়ে সকাল ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারী জনতার ওপর হামলা, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং পর্যটকদের গাড়ি বহর খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
সেনাবাহিনীর এই বর্বরোচিত হামলায় ৪০জনের অধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন। এ হামলার পরপরই সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে সেখানে ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে কথিত গোলাগুলি’র নাটক মঞ্চস্থ করে। তারা উজোবাজারসহ আশে-পাশের বিভিন্ন স্থান থেকে থেমে থেমে গুলিবর্ষণ করে জনমনে ভীতি সঞ্চার করে। এমনকি ভয়ে পালাতে থাকা লোকজনের দিকে লক্ষ্য করেও গুলিবর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেখানে সেনাবাহিনীর সাথে কারোর গোলাগুলি হয়নি, সেনাবাহিনী নিজেরাই একতরফাভাবে গুলিবর্ষণ করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইউপিডিএফ এক বিবৃতিতে সাজেকে ‘গোলাগুলির’ ঘটনাকে সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছে। বিবৃতিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেছেন, “মূলত পিসিজেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে।”
অপর এক বিবৃতিতে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ সাজেকে শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা বিবৃতিতে বলেছেন, “সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবি এলাকা থেকে পিসিজেএসএস সন্তু লারমা গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে না নিয়ে, তাদের অত্যাচার ও সশস্ত্র সন্ত্রাস বন্ধ না করে, উল্টো নিরীহ সাজেকবাসীর উপর বিনা উস্কানিতে হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এই হামলা সন্ত্রাসীদের রক্ষার জন্যই করা হয়েছে।”
এদিকে, সেনাবাহিনীর হামলা ও গুলিবর্ষণের কারণে বর্তমানে উজোবাজারসহ আশে-পাশের এলাকায় আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকার লোকজন ভয়ে দোকানপাট ও ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হযেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের তিন দফা দাবি বা শর্ত ছিল- ১. ৪৮ঘন্টা সময়ের মধ্যে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে, ২. পিসিজেএসএসের সদস্যরা কাউকে মৃত্যুর হুমকি দেবে না ও ৩. সেনা প্রশাসন কর্তৃক সাধারণ নিরীহ জনগণের ঘর-বাড়ি তল্লাশি ও হয়রানি করা যাবে না।
কিন্তু প্রশাসন দাবি বা শর্ত পূরণ না করায় গতকাল(বুধবার) সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি আহŸায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এক যৌথ বিবৃতিতে বৃহস্পতিবার থেকে পুনরায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
অপরদিকে রাঙামাটির সাজেকের উজোবাজারে এক নারীর ওপর সেনাবাহিনীর সদস্যরা অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর ২০২৬) বিকাল ৫টার সময় এ অমানবিক ঘটনাটি ঘটে। নির্যাতনের শিকার নারীর নাম সমাপ্তি চাকমা(৩০), স্বামী: চিবাবু চাকমা, গ্রাম: উলুছড়া, সাজেক, রাঙামাটি।
ঘটনা বিবরনে জানা যায়, ভুক্তভোগী সমাপ্তি চাকমা তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী অসুস্থতার কারণে দেখভাল করার জন্য খাগড়াছড়িতে যান। বৃহষ্পতিবার বিকেল ৫টার সময় তিনি খাগড়াছড়ি থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি উজোবাজারে পৌঁছলে সেখানে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করে। এতে তিনি শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের ডাকে অবরোধ পালনকালে বুহষ্পতিবার সকাল ১১টার সময় সেনাবাহিনী অবরোধকারী জনতার ওপর হামলা, বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে ৪০জনের অধিক নারী-পুরুষ আহত হন। এ ঘটনার জের ধরে সেনারা সমাপ্তি চাকমাকে নির্যাতন করেছে বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন।
অপরদিকে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইউপিডিএফের গুলিবর্ষণ হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তিন হাজার পর্যটক উদ্ধার। তবে ইউপিডিএফ সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সেনাবাহিনীর গোলাগুলির খবর সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছে। পার্বত্য রাঙামাটির সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের(ইউপিডিএফ)।
এ ঘটনায় সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাজেকে ভ্রমণরত অবস্থায় আটকা পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে ২০৩ব্রিগেড’র বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর(আইএসপিআর) জানিয়েছে, সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। পর্যটকবাহী যান চলাচলের সময় সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এতে পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। তবে সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫মিনিটের দিকে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। পরে পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে প্রাথমিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যের বরাতে বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং তাঁদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।
আইএসপিআরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা, পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক অবরোধে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স¤প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানায় আইএসপিআর।
অন্যদিকে রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপারের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকাসহ কতিপয় সংবাদ মাধ্যমে বাঘাইছড়ির সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে বৃহষ্পতিবার দুপুরে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি চলেছে বলে যে খবর প্রচার করা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট আখ্যায়িত করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)।ড়
বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর ২০২৬ এক বিবৃতিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, বৃহস্পতিবার কোন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার জনগণের সাথে কথা বলে এমন খবরের সত্যতার বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি। মূলত পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অংগ্য মারমা শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের উপর ববর হামলা, লাঠিচার্জ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও নিন্দা জানান। তিনি অবিলম্বে সাজেকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে উক্ত এলাকা থেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সরিয়ে নেওয়ার ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)’র প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
পুলিশের বক্তব্য, সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় অবরোধকারীদের হামলায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের অন্তত ছয় সদস্য আহত হয়েছেন। সাজেক থেকে পর্যটকদের গাড়িবহর ছেড়ে যাচ্ছে এমন সময় সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় সেনা-পুলিশসহ ৬জন আহত হয়েছে। রাঙামাটির সাজেক সড়কের উজোবাজারে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
পর্যটকবাহী যানবাহন পার করে দেওয়ার জন্য সড়কের ব্যারিকেড সরানোর আহŸান জানালে অবরোধকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে প্রথমে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে অবরোধকারীরা গুলিবর্ষণ শুরু করলে আত্মরক্ষার্থে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। এতে দুপুর একটা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা উভয় পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে ব্যাপক গুলিবিনিময় চলে।
বুহষ্পতিবার দুপুরে রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, অবরোধকারীদের হামলায় সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য জখম হয়েছেন। প্রায় দুই ঘণ্টার এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির পর নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হলেও সাজেকে অবস্থানরত সব পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে দিঘীনালার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এই সশস্ত্র হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ১১ই অক্টোবর অবরোধ পালনকালে বিকেলে স্থানীয় সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন দুই সংগঠন ও সাজেকবাসীর উত্থাপিত তিন দফা দাবি বা শর্ত মেনে নিলে ৪৮ঘন্টার জন্য সড়ক অবরোধ স্থগিত করা হয়। এরপর শর্ত পূরণ না হওয়ায় ১৫ই অক্টোবর আবার তারা অবরোধ পালন করে। পরে শারদীয় দুর্গোৎসবের কারণে ১৬থেকে ২১শে অক্টেবর অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
প্রসঙ্গত, সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(পিসিজেএসএস) ‘সশস্ত্র সদস্যদের’ সরিয়ে নেয়াসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে আবারও তৃতীয় দফায় রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ডাকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন নামে স্থানীয় দুটি সংগঠন।
তবে সংগঠন দুটি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ ঘনিষ্ঠ। সাজেকে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগটি বরাবরই অসত্য বলে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)। এ নিয়ে চার দফায় অবরোধ কর্মসূচির জেরে এখন থমথমে সাজেক উপত্যকা।






























