খননের মাটি ‘অভিশাপ’: খুলনার ডুমুরিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে ধ্বংসের মুখে শতাধিক পরিবার

ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে নেওয়া নদী খনন প্রকল্প যা হওয়ার কথা ছিল মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা, সেটিই এখন খুলনার ডুমুরিয়ার শতাধিক পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে এক নির্মম দুর্যোগ হয়ে। বুড়ী ভদ্রা নদীর খননকৃত মাটির চাপে আটলিয়া ইউনিয়নের কাঁঠালতলা ও বরাতিয়া এলাকার দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

প্রকল্প এলাকা থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশেই ফেলে রাখায় সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। মাটির বিশাল স্তূপে ঘিরে গেছে বসতভিটা। কোথাও ঘরের দেয়ালে বড় বড় ফাটল, কোথাও টিনের চালা ভেঙে পড়েছে। অনেক পরিবারের একমাত্র সুপেয় পানির উৎস টিউবওয়েল পর্যন্ত চাপা পড়ে গেছে মাটির নিচে। ফলে আশ্রয়, পানি জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এসব মানুষ।

ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেক পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের অসহায় দৃষ্টি এবং নারীদের নিরাপত্তাহীনতা মিলিয়ে এলাকায় বিরাজ করছে এক হৃদয়বিদারক মানবিক সংকট। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর অবশেষে প্রশাসনের নজরে আসে পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ আজীম আহমেদ। তার সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঃ রেজাউল করীম, ভবদহ এলাকার ছয়টি নদী খনন প্রকল্পে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মামুনুর রশীদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আবুল বাশার, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বি এম আব্দুল মোমিন এবং যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী।

পরিদর্শনকালে অতিরিক্ত সচিব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বক্তব্য শোনেন এবং সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। তিনি দ্রুত প্রকল্প এলাকা থেকে মাটি অপসারণের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত করে বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিলেই বাড়ছে আতঙ্ক কখন আবার ধসে পড়ে শেষ সম্বলটুকুও হারাতে হয়।

প্রশাসনের আশ্বাস পেলেও তা কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে সংশয় কাটছে না ভুক্তভোগীদের মধ্যে। অনেকেই বলছেন, শুধু আশ্বাস নয় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি উন্নয়ন প্রকল্প যার লক্ষ্য মানুষের কষ্ট লাঘব করা, সেটিই যদি মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেয়, তবে তার দায় কে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে ডুমুরিয়ার সেই শতাধিক পরিবার, যাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া নিরাপদ আশ্রয় এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা।