যেখানে ট্রাম্প সেখানেই পুতিন-শি, মিশর-মরক্কো-সুদানে হচ্ছে কী?

২০২৬ সালের আগস্টের শেষদিকে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা করেছে মিশর-যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী (ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস) মাইকেল জে. রিগাসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
এই বৈঠকের মাধ্যমে আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মিশরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। মিশরের স্টেট ইনফরমেশন সার্ভিস জানিয়েছে, দুই পক্ষই তাদের সম্পর্ক সুসংগঠিত করতে জোর দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাদের অংশীদারত্ব এখনো ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়তে থাকায় বৈঠকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আবদেলাত্তি সংকট ও বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধান এবং সংলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর আফ্রিকায় পরাশক্তির প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র ও মিশরের এই কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে উত্তর আফ্রিকা। চীন ও রাশিয়াও অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক বিভিন্ন মাধ্যমে এই অঞ্চলে নিজেদের সম্পর্ক আরও গভীর করছে। তবে, উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে পুরোপুরি জোটবদ্ধ না হয়ে ক্রমেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ-মিশর।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে কায়রো। বর্তমানে মিশরে দুই দেশের বিমানবাহিনী ‘ইগলস অব সিভিলাইজেশন’ নামে যৌথ মহড়ার দ্বিতীয় পর্ব পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে মরক্কো। দেশটির বাদশাহ মোহাম্মদ ষষ্ঠ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুসম্পর্কও দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সম্প্রতি ১,০৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিজনিত-দাখলা এক্সপ্রেসওয়ের নাম ‘ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প হাইওয়ে’ রাখে মরক্কো। ২০২০ সালে পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই স্বীকৃতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটন মরক্কোর এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বহর আধুনিকায়নের অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে মরক্কো এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টারও সংগ্রহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও মরক্কো আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক বহুজাতিক সামরিক মহড়া ‘আফ্রিকান লায়ন’-এরও যৌথ আয়োজক।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলজেরিয়া
আলজেরিয়া অবশ্য ভিন্ন পথ অনুসরণ করছে। দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। আলজেরিয়া উন্নত রুশ সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে, যার মধ্যে সু-৩৪এম যুদ্ধবিমানও রয়েছে।
এদিকে লিবিয়াতেও সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল জিওস্পেশাল-ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির টিয়ারলাইন প্রকল্পে উদ্ধৃত স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে লিবিয়ার ছয়টি বিমানঘাঁটিতে নির্মাণ ও সংস্কারকাজের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘাঁটির সঙ্গে রাশিয়ার আফ্রিকা-সংক্রান্ত উপস্থিতির যোগসূত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘাঁটিগুলোতে হ্যাঙ্গার, রানওয়ে, ব্যারাক ও অন্যান্য অবকাঠামোর কাজ চলছে। এতে বোঝা যায়, উত্তর আফ্রিকায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে মস্কো।
মিশর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সব মিলিয়ে উত্তর আফ্রিকা এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আর মিশর এই প্রতিযোগিতায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
কায়রো একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। ফলে মিশরের কৌশল হচ্ছে কোনো একটি পরাশক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো এবং নিজের কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিকল্প বাড়িয়ে রাখা।
সুদান সংকট ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা
সুদানের পুরো ভূখণ্ডে জাতিসংঘের দুই দশক পুরোনো অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের জন্য চাপ দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমানে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দারফুর অঞ্চলের ক্ষেত্রে কার্যকর থাকলেও তা পুরো সুদানে সম্প্রসারণ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে রাশিয়া ও চীন এই নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছে। সুদানের সরকারও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে- আফ্রিকার অন্যতম প্রাণঘাতী সংঘাতে বিদেশি অস্ত্র ও ড্রোনের সরবরাহ সীমিত করা। এতে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা এই যুদ্ধের অবসানের প্রচেষ্টাও আরও জটিল হয়ে উঠছে। জাতিসংঘ সুদান সংকটকে বিশ্বের সর্বোচ্চ মানবিক বিপর্যয় বলে বিবৃতি দিয়েছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম






























