বিশ্ব পর্যটন দিবসে ইতিহাসের আঙিনায় বর্ণিল সাজে পাহাড়পুর

ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার। হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপনার সামনে দাঁড়ালে যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রাচীন বাংলার জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক সমৃদ্ধ অধ্যায়।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব পর্যটন দিবসে সকাল থেকেই পাহাড়পুরে ছিল উৎসবের আমেজ। বর্ণিল সব আয়োজনে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে পাহাড়পুর চত্বরে বাউল শিল্পীরা গানের মাধ্যমে পাহাড়পুরের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কে তুলে ধরে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন প্রত্নবস্তু দেখার সুযোগ করে পাহাড়পুর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।
পর্যটন দিবসে র্যালী শেষে আলোচনা সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি। প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক একে এম সাইফুর রহমান।
দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পাহাড়পুরের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব, পর্যটন সম্ভাবনা এবং এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটনশিল্পের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে বিশ্ব ঐতিহ্যের এই নিদর্শন সংরক্ষণে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও বৌদ্ধ সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পাল আমলে নির্মিত সোমপুর মহাবিহার একসময় বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও জ্ঞানসন্ধানীরা এখানে আসতেন বলে ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়।
স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর থেকেই বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটন মানচিত্রে পাহাড়পুরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে পাহাড়পুরে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও ছিল উচ্ছ্বাস। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরেছেন, কেউ ছবি তুলেছেন প্রাচীন স্থাপনার সামনে। আবার অনেকে জানতে চেয়েছেন এর ইতিহাস ও স্থাপত্যের নানা তথ্য।
মেহেজাবিন নামে এক দর্শনার্থী বলেন, “বইয়ে পাহাড়পুরের কথা পড়েছি। সামনে এসে এর বিশালত্ব ও স্থাপত্য দেখে আরও বেশি মুগ্ধ হয়েছি। এমন আয়োজন পর্যটকদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে।”
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন নয়, সারা বছরই পাহাড়পুরকে ঘিরে পর্যটন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হোক। পর্যটকদের জন্য উন্নত তথ্যসেবা, বিশ্রাম, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলছেন তাঁরা।
স্থানীয় রাজু নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “পাহাড়পুরে পর্যটক বাড়লে শুধু দর্শনীয় স্থানটির পরিচিতিই বাড়বে না, স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগও বাড়বে। পর্যটনকে ঘিরে ছোট ব্যবসা, খাবারের দোকান, পরিবহনসহ নানা খাতের প্রসার ঘটতে পারে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের এবারের আয়োজন তাই শুধু একটি দিবস উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পাহাড়পুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে আনার পাশাপাশি বিশ্ব ঐতিহ্যের এই নিদর্শনকে আরও কার্যকরভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কাস্টডিয়ান মোহাম্মদ ফজলুল করিম বলেন, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে রাস্তা,লেক,ফুটপাত,উন্মুক্ত মঞ্চ, গাড়ী পার্কিং,আধুনিক টিকিট কাউন্টার,গন শৌচাগার,ভিআইপি লাউঞ্চ সহ নানা কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বিভাগ প্রাচীন এই বিহার কে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে।




















