কথিত উপদেষ্টা পরিষদের হাতে ‘জিম্মি’ সাংবাদিক সংগঠন, মূল গঠনতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে গিয়ে বহিষ্কার সভাপতি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (জবিরিইউ) গঠনতন্ত্র পরিবর্তন, ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং অ-সাংবাদিক উপদেষ্টাদের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। মূল গঠনতন্ত্র পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়া এবং সংগঠন দখলে বাধা দেওয়ায় সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পদচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৯ জুলাই আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, নথিপত্রে স্বাক্ষর জালিয়াতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে সংগঠনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমকে বহিষ্কার করা হয়। তবে সংগঠনের সাংবাদিকদের দাবি, এসব অভিযোগের বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি বিরোধী পক্ষ। উল্টো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টেন্ডার বাণিজ্যের বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এই বিতর্কিত বহিষ্কারাদেশে স্বাক্ষর করেছেন সংগঠনের কথিত প্রধান উপদেষ্টা ইমতিয়াজ উদ্দিন এবং আরও দুই কথিত সিনিয়র উপদেষ্টা আবু হানিফ ও রিসাত রহমান। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই তিনজনের কেউই বর্তমানে সক্রিয় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত নন। প্রধান উপদেষ্টা ইমতিয়াজ উদ্দিন বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে অবস্থানরত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় উপদেষ্টা আবু হানিফ একজন চাকরিপ্রত্যাশী এবং অপর উপদেষ্টা রিসাত রহমান পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা। পেশাদার সাংবাদিকতার বাইরে থাকা এসব ব্যক্তির হাতে সাংবাদিক সংগঠনের ভাগ্য নির্ধারণ এবং সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ সদস্যরা।

গঠনতন্ত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, জবিরিইউ-এর মূল গঠনতন্ত্রের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংগঠনে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপদেষ্টা হিসেবে ট্রেজারার এবং বাকি দুজন উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকার কথা।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালে তৎকালীন সভাপতি ইমতিয়াজ উদ্দিন সংগঠন ছাড়ার পরও প্রভাব ধরে রাখতে গঠনতন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। মূল গঠনতন্ত্র বাইপাস করে তিনি উপাচার্য ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের ক্ষমতা খর্ব করে তাদের কেবল ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে সীমিত করেন। অন্যদিকে সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের ‘উপদেষ্টা’ বানিয়ে তাদের হাতে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়—যাতে তারা নির্বাচন পরিচালনা থেকে শুরু করে সংগঠন সংশোধন পর্যন্ত সব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

একইভাবে নির্বাচন সংক্রান্ত ১০ নম্বর ধারা বদলে দেওয়া হয়। আগে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী কমিটির প্রতিনিধির সমন্বয়ে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠনের নিয়ম থাকলেও তা পরিবর্তন করে উপদেষ্টা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত করা হয়।

সবচেয়ে বড় রদবদল ঘটানো হয় ১৫ নম্বর ধারায়। মূল গঠনতন্ত্রে সাধারণ পরিষদকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক ধরা হতো এবং দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের মতে সিদ্ধান্ত হতো। কিন্তু সংশোধিত বিধানে জুড়ে দেওয়া হয়—সাধারণ পরিষদের যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত, গঠনতন্ত্র সংশোধন বা শৃঙ্খলাবিষয়ক পদক্ষেপ কেবল উপদেষ্টা পরিষদের ‘সমন্বয় ও মতামত’ সাপেক্ষে কার্যকর হবে। ফলে পুরো সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ মূলত তিন অ-সাংবাদিক উপদেষ্টার পকেটে চলে যায়।

বর্তমান সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম সংগঠনের এই অচলাবস্থা ও গঠনতন্ত্র বিকৃতি অনুধাবন করে মূল গঠনতন্ত্র পুনর্বহালের উদ্যোগ নেন। তিনি সংগঠনের প্রকৃত প্রধান উপদেষ্টা অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পুরো বিষয়টি অবহিত করেন। উপদেষ্টা প্যানেলের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর এই উদ্যোগ জানাজানি হতেই জাহাঙ্গীর আলমের ওপর চড়াও হয় অ-সাংবাদিকদের এই সিন্ডিকেট। সংগঠনকে তাদের দখলমুক্ত করা থেকে থামাতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে নানান মনগড়া অভিযোগ এনে তড়িঘড়ি করে বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়।

বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ সাংবাদিকদের মতে, একটি সক্রিয় সাংবাদিক সংগঠনের নীতি নির্ধারণী জায়গায় অ-সাংবাদিকদের এই ধরণের একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা সংগঠনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। দ্রুততম সময়ে উপাচার্যের হস্তক্ষেপে মূল গঠনতন্ত্র পুনর্বহাল করে সংস্থাকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ সদস্যরা।