তিন পার্বত্য জেলার বিএনপি সরকারের আমলেও পার্বত্যাঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে

খাগড়াছড়ি রাংগামাটি বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলার বিএনপি সরকারের আমলেও পার্বত্যাঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে বলে পিসিজেএসএস প্রতিবেদন উঠে এসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার স্বাক্ষরে বুধবার (১লা জুলাই ২০২৬) পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর অর্ধ-বার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জনসংহতি সমিতি। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহতভাবে চলছে।
উক্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয় যে, গত ১২ই ফেব্রæুয়ারি ২০২৬অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) সরকার গঠন করে।
গত ১৭ই ফেব্রæুয়ারি ২০২৬শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাঙ্গামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ছিল পার্বত্য চুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং কাক্সিক্ষত।
কিন্তু একই দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে বাঙালি স¤প্রদায়ের নির্বাচিত সংসদ সদস্য (চট্টগ্রাম-৫) মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ছিল চুক্তির মূল স্পিরিটের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনাকাক্সিক্ষত।
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সরানোর দাবি করলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আরো উদ্বেগজনক যে, পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ১০২দিনের মাথায় নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে দীপেন দেওয়ানকে বিগত পহেলা জুন পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
এরপর এখনো পার্বত্য মন্ত্রী হিসেবে কোনো জুম্মকে নিয়োগ করা হয়নি। বর্তমানে পার্বত্য চুক্তি লঙ্ঘন করে বিএনপি সরকার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে দিয়ে অবৈধভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়কে পরিচালনা করছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, গত ১১ই মার্চ ২০২৬এক আলোচনা সভায় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন যে, রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি আমরা ১০০শতাংশ হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের বিষয়টা নজরে নিয়ে আসি, তাহলে আমাদের ডিফেন্স ফোর্সকে অনেক কিছু প্রয়োগ করতে দিতে পারব না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এধরনের বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা যেমন সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি অব্যাহত মানবাধিকার লংঘনকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জাতীয় মতামত মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক বলে বিবেচনা করা যায়।
বিএনপি কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রায় সাড়ে চার মাস অতিক্রান্ত হলেও ১৯৯৭সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক সামরিকায়ণের মাধ্যমে ফ্যাসীবাদী কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রাাম সমস্যার সমাধানের নীতি অব্যাহত রেখেছে।
ফলে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। পূর্বের মতই নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক জুম্ম জনগণের উপর নানা ধরনের নিপীড়ন, মানবাধিকার হরণ, সেনামদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক পার্বত্য চুক্তির সমর্থক ও নিরীহ জুম্মদের উপর সন্ত্রাস এবং সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কর্তৃক জুম্মদেরকে হামলা, হয়রানি, ভূমি বেদখল, পার্বত্য চুক্তি বিরোধী তৎপরতা, ধর্মান্তরকরণ ও জুম্ম নারী-শিশুদের উপর সহিংসতা ইত্যাদি অব্যাহত রয়েছে।
২০২৬সালের জানুয়ারি হতে জুন মাস পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা-মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রæুপ, সা¤প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী, মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যুদের দ্বারা ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এসব ঘটনায় ১৫৪জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় ১০জনকে হত্যা করা হয়েছে।
সংঘটিত ৫৭টি ঘটনার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ২৪টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এতে কমপক্ষে ৪৫জন লোক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে এবং ২১টি গ্রামে টহল অভিযান চালানো হয়। নতুন করে ৩৪টি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
৫৭টি ঘটনার মধ্যে ইউপিডিএফ(প্রসিত), মগপার্টি খ্যাত মারমা লিবারেশন পার্টি, বমপাটি খ্যাত কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট(কেএনএফ) ইত্যাদি সেনা-সৃষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রæুপ কর্তৃক ১২টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এতে ২জনকে হত্যাসহ ২৭জন ব্যক্তি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারধর, হত্যা, গুলিতে আহত, তল্লাসী, হত্যার হুমকি, টাকা ও মোবাইল ছিনতাই, চাঁদা দাবি ইত্যাদি ঘটনার ছিল।
ইউপিডিএফ নামে-বেনামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পিসিজেএসএসের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গোয়েবলসীয় কায়দায় বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত অপপ্রচার জোরদার করেছে।
শুধু তাই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল(জাক) এর সভাপতি শিশির চাকমা, মেত্তা ট্যুর এন্ড ট্রাভেলের প্রধীর তালুকদার রেগা, চাকমা সাহিত্য একাডেমীর পরিচালক ইনজেব চাকমা, পুলিশ সার্জেন্ট প্রিয়দর্শী চাকমা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী পহেলা চাকমা, অগাষ্টিনা চাকমাসহ ডজন খানেক সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর’ অপপ্রচার চালাচ্ছে। ইউপিডিএফের এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় উঠে।
৫৭টি ঘটনার মধ্যে মুসলিমবাঙালি সেটেলার, ভূমিদস্যু ও রোহিঙ্গ্যা সন্ত্রাসী কর্তৃক ১০টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এতে ৪জনকে হত্যা ও ৪৩জনকে আহতসহ ৬৯জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে।
একটি সা¤প্রদায়িক হামলার ঘটনায় হামলাকারী সেটেলার ও রোহিঙ্গ্যা কর্তৃক উল্টো হামলার শিকার ১০জন ম্রো গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। বান্দরবানে অনুপ্রবেশকালে ২১জন রোহিঙ্গ্যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।
বান্দরবান জেলাধীন বিভিন্ন উপজেলায় জুম্মদের বিশেষ করে ম্রো, ত্রিপুরা এবং কতিপয় চাকমা জাতিগোষ্ঠীকে দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরকরণের প্রক্রিয়া এখনো জোরদার রয়েছে।
পড়াশুনা করানোর লোভ দেখিয়ে ছোট ছোট কোমলমতি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার সহ বান্দরবানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের অজান্তে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ এবং নিজ জাতি গোষ্ঠীর নাম, পোশাক পরিবর্তন করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠে আসছে।






























