প্রবীণরাই সমাজের আসল নোঙর: সাতক্ষীরায় পালিত হলো আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

জীবনের এক দীর্ঘ ও মেঠোপথ পেরিয়ে আসা মানুষগুলো আমাদের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। তাঁদের ললাটের প্রতিটি বলিরেখা যেন একেকটি অভিজ্ঞতার গল্প বলে, আর মাথার শ্বেতশুভ্র চুল জানান দেয় একঝাঁক ঝোড়ো দিন পার করে আসার ইতিহাস। প্রবীণরা কেবল বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কোনো গোষ্ঠী নন, তাঁরা আমাদের সমাজের মূল ভিত্তি ও পরম আশ্রয়। তাঁদের মেধা, প্রজ্ঞা ও জীবনবোধকে রাষ্ট্র গঠনের ক্যানভাসে অনন্য রঙে সাজাতে হবে।

শনিবার সকালে ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’—এই দূরদর্শী প্রতিপাদ্যকে বুকে ধারণ করে সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম সংলগ্ন প্রবীণ কল্যাণ সংস্থার কার্যালয়ে এক আবেগঘন পরিবেশে পালিত হলো আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬। র‍্যালি আর প্রাণবন্ত আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিনটি স্মরণ করেন শহরের প্রবীণ ও নবীন সুধীজন।

সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সুশান্ত কুমার ঘোষের প্রাজ্ঞ সভাপতিত্বে এবং নির্বাহী সদস্য শহীদুর রহমানের নিখুঁত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসনে ছিলেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ। চেনা ছকের বাইরে গিয়ে প্রবীণদের প্রতি এক গভীর প্রীতি ও শ্রদ্ধায় আবেশিত হয়ে ওঠে তাঁর বক্তৃতা।

জেলা প্রশাসক আবেগশ্রুত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের অতীত না থাকলে যেমন বর্তমান দাঁড়াতে পারে না, তেমনি প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ছাড়া ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। জীবনের হাজারো ঝড়ঝাপ্টা সয়ে আসা এই মানুষগুলো সমাজের এক অমূল্য রত্ন। তাঁদের অর্জিত সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা ও জীবনদর্শনের আলোই পারে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে।

নীতিনির্ধারণী প্রতিটি পদক্ষেপে যদি আমরা তাঁদের সেই প্রজ্ঞাকে সযতনে কাজে লাগাতে পারি, তবেই আমাদের উন্নয়ন অর্থবহ হবে।”

অতীতে ফিরে তাকিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, “আশির বা নব্বইয়ের দশকে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৫০ বছরের কাছাকাছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির ফলে আজ আমাদের গড় আয়ু বেড়ে পুরুষের ক্ষেত্রে ৭৩ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৭৭ বছর ছাড়িয়েছে। তবে আয়ু বৃদ্ধির এই আনন্দের সাথে যুক্ত হতে হবে তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা।”

অনুষ্ঠানে উঠে আসে প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও আত্মমর্যাদার নানা বাস্তবমুখী দাবি। প্রবীণদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দেন, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবনা পাওয়া মাত্রই তা স্বাস্থ্য সেবা সচিবের কাছে পৌঁছানো হবে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সব নীতি-কমিটিতে প্রবীণদের অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

আলোচনার পাশাপাশি প্রবীণদের শারীরিক সুস্থতা ও স্বস্তিময় সময় কাটানোর স্থান নিয়েও ওঠে আশার কথা। শহরের বুক চিরে যাওয়া প্রাণসায়র খালের সৌন্দর্য বর্ধন ও আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণের প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, “ইতিমধ্যেই ওয়াকওয়ের অর্থ সংস্থান চূড়ান্ত হয়েছে। অর্থ ছাড় পেলেই পৌরসভা কাজ শুরু করবে। তবে খালটিকে তার স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে দিতে ভেতরের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।”

একই সাথে প্রবীণদের প্রাত্যহিক হাঁটার আনন্দ ও নির্মল বিনোদন নিশ্চিত করতে ‘ডিসি ইকো পার্ক’-এ চলছে চোখজুড়ানো নানা পরিবর্তন। ওয়াকওয়ে, জিরিয়ে নেওয়ার নান্দনিক বিশ্রামাগার আর ক্যাফেটেরিয়ার কাজ জোরকদমে এগিয়ে চলছে, যা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই পূর্ণতা পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও সমাজ সেবক মোঃ ফজলুর রহমান, সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল হামিদ, ইঞ্জিনিয়ার আবিদুর রহমান, মিসেস রোকেয়া রহমান ও কাজী আবু হেলাল। জীবনের শেষ বিকেলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে আত্মমর্যাদা আর আশার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক অন্যরকম বার্তা নিয়ে শেষ হয় এই মেলবন্ধন।