ফ্যামিলি কার্ড: নির্বাচনী কৌশল নাকি সামাজিক সুরক্ষা?

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ এখন ‘ফ্যামিলি কার্ড’। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এক ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশে নেতাকর্মীদের বক্তব্য, প্রচারণা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এই কার্ড ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক ও প্রশ্ন।

গত ৩১ জুলাই রাজধানীর শহীদ আবু সাইদ মিলনায়তনে জুলাই শহীদদের স্মরণে মহিলা দলের আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তারেক রহমান প্রথমবারের মতো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে একজন মায়ের চোখে দেখা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে। সে লক্ষ্যেই বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে প্রথম পর্যায়ে অন্তত ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, যার প্রধান হবেন পরিবারের নারী সদস্য।

তারেক রহমানের বক্তব্যের পরপরই দলীয় নেতাকর্মীদের বক্তব্যে এই প্রতিশ্রুতি আরও বিস্তৃত আকার নেয়। কোথাও বলা হচ্ছে ৫০ লাখ পরিবার, কোথাও আবার ৫০ কোটি মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা। বগুড়ার শিবগঞ্জে এক ইউনিয়ন বিএনপি নেতা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফ্যামিলি কার্ড দেখিয়ে ভোট চান| কুমিল্লার দেবিদ্বারে এক যুবদল নেতার বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি বলেন তারেক জিয়া ৫০ কোটি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করবেন। ফ্যামিলি কার্ডে কি পরিমান সাহায্য করা হবে তা নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে জগা খিচুড়ি কেউ বলছেন ২ থেকে ৩ হাজার কেউ বা বলছেন ৮-১০ হাজার। বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পরিমাণ টাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা।

এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন নিজেদের মতো করে। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে, যাতে সার ও কৃষি উপকরণ পেতে হয়রানি না হয়।

ঢাকা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি বলেন, দেশের প্রতিটি পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে, যা ৩১ দফা কর্মসূচির প্রথম বাস্তবায়ন হবে। চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কম দামে পাওয়া যাবে এবং বিশেষ করে নারীদের হাতে এই কার্ড দেওয়া হবে।

এমন বক্তব্যের ভিড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও জোরালো। কেউ প্রশ্ন তুলছেন অর্থায়নের উৎস নিয়ে, কেউ বলছেন এটি নির্বাচনী প্রতারণা, কেউ আবার আগের সরকারের দেওয়া ১০ টাকা কেজি চালের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তুলনা করছেন। সমালোচকদের মতে, দেশের সম্পদ লুটের নতুন পথ হিসেবেই এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

তবে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ মহলের ভাষ্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, স্বৈরশাসনামলে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ ছিল, পাশাপাশি চরিত্র হননের রাজনীতিও চলেছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বক্তব্য, আচরণ ও কর্মপরিকল্পনায় তাঁকে ভিন্ন ধারার রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হিসেবে তিনি তুলে ধরছেন নারীর মর্যাদা, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের নারীপ্রধান বা গৃহকর্ত্রী হবেন এই কার্ডের প্রাপক। সুবিধাভোগী নির্বাচন হবে আয়, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে। স্থানীয় পর্যায়ে খোলা সভা এবং পরে ডিজিটাল আবেদনের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার কথাও বলা হচ্ছে। কার্ডের আওতায় মাসে নগদ অর্থ বা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ হতদরিদ্র, যার মধ্যে এক কোটির মতো মানুষের নিয়মিত খাবার জোটে না। সরকারের বিদ্যমান কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও পরিসংখ্যান বলছে, সুবিধাভোগীদের বড় অংশই প্রকৃত দরিদ্র নন। এই প্রেক্ষাপটে নতুন একটি বড় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। অর্থায়ন, সঠিক পরিবার নির্বাচন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা-সবই বড় চ্যালেঞ্জ।

তবু ফ্যামিলি কার্ড ধারণার একটি আলাদা দিক রয়েছে। এটি যদি সত্যিই সার্বজনীন হয় এবং নারীকেন্দ্রিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এতে দুর্নীতির সুযোগ কমতে পারে, খাদ্য নিরাপত্তা বাড়তে পারে এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতা আসতে পারে। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে-ভোটের মাঠে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কি শুধুই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, নাকি বাস্তবায়নযোগ্য একটি সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনা। এর উত্তর মিলবে প্রতিশ্রুতির ভাষণে নয়, বরং বাস্তবায়নের রূপরেখা, অর্থের উৎস ও স্বচ্ছতার প্রমাণে। তারেক রহমানের জন্য চ্যালেঞ্জ এখানেই-ফ্যামিলি কার্ড যে কেবল কথার কথা নয়, সেটি কাজে প্রমাণ করা।