মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে ১১ জুলাই থেকে চলমান লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি

গত ১১ জুলাই, ২০২৩ থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সরকারি ও বেসরকারি বৈষম্য দূরিকরণের লক্ষ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী সর্ববৃহৎ শিক্ষক সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (ইঞঅ)’র আহবানে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পূর্বঘোষিত ‘লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি’ চলছে। পাশাপাশি একই দাবিতে ১৪ জুলাই সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ হলে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার জন্য সংবাদ সম্মেলন আহবান করা হয়েছে।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শেখ কাওছার আহমেদ-এর সঞ্চালনায় এবং সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রহমান মিয়া’র সভাপতিত্বে সারাদেশ থেকে আগত লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর উপস্থিতিতে শিক্ষক-কর্মচারীগণ ১১ জুলাই সকাল ১০টা থেকে কর্মসূচি শুরুর প্রাক্কালে অসংখ্য পুলিশ হঠাৎ শিক্ষকদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ করার অপচেষ্টাকালে সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রহমান মিয়া আহত হন এবং জ্ঞান হরিয়ে ফেলেন। এমতাবস্থায় শিক্ষক-কর্মচারীগণ ইস্পাত কঠিন ঐক্য নিয়ে পুলিশের আক্রমনণ প্রতিহত করে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারে সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দিবা-রাত্র অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রহমন মিয়া’র অসুস্থতার কারণে সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শেখ কাওছার আহমেদ মাধ্যমিক শিক্ষক শিক্ষা জাতীয়করণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত যে কোন মূল্যে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবার ঘোষণা দেন।

শিক্ষক নেতৃবৃন্দ ক্ষোভের সাথে বলেন, এমপিওভূক্ত শিক্ষকগণ মাত্র ২৫% উৎসব ভাতা, ১,০০০ টাকা বাড়ি ভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। অথচ একই কারিকুলামের অধীন একই সিলেবাস, একই একাডেমিক সময়সূচি, একইভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত থেকেও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে পাহাড়সম বৈষম্য। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেল সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেলের একধাপ নিচে প্রদান করা হয়। তাছাড়া সহকারি প্রধান শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল প্রদান না করার ফলে উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও সহকারি প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল সমান হওয়ায় সহকারি প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে বছরের পর বছর উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় শহরে সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, প্রতীকি অনশন, অবস্থান ধর্মঘট, কর্মবিরতিসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর নিকট বারবার স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরে যাবার পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষক/কর্মচারী টাকা পাওয়ার পূর্বেই অর্থাভাবে বিনা চিকৎসায় মৃত্যুবরণ করছেন। তাছাড়া কয়েক বছর যাবৎ কোন প্রকার সুবিধা না দিয়েই অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট খাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪% কর্তন করা হচ্ছে যা অত্যন্ত অমানবিক। তাই অতিরিক্ত ৪% কর্তনের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলসহ অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট অফিস ঘেরাও করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু অদ্যাবধি কোন প্রতিকার পাননি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে একটি যুদ্ধবিধস্ত দেশে প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমকি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধু তনায়া শিক্ষা ও শিক্ষক বান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এমতাবস্থায় দেশ ও জনগণের স্বার্থে দ্রুত জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়ন, শিক্ষায় বিনিয়োগে ইউনেস্কো-আইএলও’র সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নসহ সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করার জোর দাবি জানান।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)’র অনুমোদি ১৪৬টি সুপারিশ সম্বলিত শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক সনদের সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের ২০% অথবা জিডিপির ৬% বরাদ্দের কথা উল্লেখ থাকলেও ২০২২-২৩ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটের ১১.৯২% অথবা জিডিপির ২% এরও কম বরাদ্দ রাখায় সারাদেশের শিক্ষক-কর্মচারীগণ মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হন। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য, অস্থিরতা ও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সমালোচনার দায় সরকারকে নিতে হচ্ছে। যা জাতি হিসেবে কারো জন্যই সুখকর নয়। তাই ২০২০-২০২৪ অর্থ বছরে জাতীয় বাজেটের ২০% অথবা জিডিপির ৬% বরাদ্ধ রাখার জন্য আহবান জানানো হয়েছিল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। স্বপ্নের পদ্মা সেতু তৈরি, বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ, রূপপুর পারমানবিক বিদুৎ কেন্দ্র ও মাতার বাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে কোটি কোটি বই বিতরণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন, মেট্রোরেল নির্মাণ, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে, শিক্ষা ও শিক্ষকদের উন্নয়ন সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণা দেয়ায় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)’র পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। বক্তাগণ আরো বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা স্মার্ট করতে হলে দরকার স্মার্ট শিক্ষক। তাই স্মার্ট শিক্ষক পেতে শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের কোন বিকল্প নেই ।

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাণের দাবি মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ। গত ০৮ মার্চ ২০২৩ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষিত কর্মসূচি ১৩ মার্চ, ২০২৩ সারাদেশের জেলা সদরে ও কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শিক্ষক- কর্মচারীদের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল এবং জেলা প্রশাসক/বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ১৪ মার্চ, ২০২৩ বেসরকারি সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালনসহ ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় এবং জাতীকরণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে লিফলেট বিতরণ করা হয়। গত ২০ মার্চ, ২০২৩ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মহাসমাবেশে ২০২৩-২০১৪ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়ার আহবান জানান। ব্যর্থতায় ১১ জুলাই ২০২৩ থেকে ঢাকয় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। তাই জাতীয়করণের ঘোষণা না দেয়ায় এবং বাজেটে বিগত বছরগুলোর চেয়েও কম বরাদ্দ রাখায় ১১ জুলাই ২০২৩ থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পূর্বঘোষিত লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি চলছে এবং অবস্থান কর্মসূচিতে আরও শিক্ষক-কর্মচারী আসতে শুরু করেছেন। এমতাবস্থায় সরকারের তরফ থেকে কোন আশ্বাস কিংবা যোগাযোগ না করায় আগামী ১৪ জুলাই ২০২৩ জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ হলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ( BTA )।