যশোরে প্রার্থী বদল ও কোন্দলে বিএনপি, সুবিধায় জামায়াত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রাচীনতম শহর যশোরে রাজনীতির মাঠ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপির শেষ মুহূর্তের প্রার্থী পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অসন্তোষের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে ভোটের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও নতুন সমীকরণ।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোর জেলায় এবার মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় জেলার প্রতিটি আসনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে কার্যত অনুপস্থিত থাকায় অধিকাংশ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ভেতরের টানাপোড়েন ও বিভাজনের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে জামায়াত।
যশোর-১ (শার্শা): মাঠে এগিয়ে জামায়াত শার্শা আসনে তৃণমূলের চাপের মুখে বিএনপি শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। সাবেক সংসদ সদস্য মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে বাদ দিয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হলেও দলীয় বিভক্তি পুরোপুরি কাটেনি।
অন্যদিকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আজীজুর রহমান মিষ্টভাষী ও বিনয়ী আচরণে সংগঠিত প্রচারণা চালিয়ে মাঠে বেশ এগিয়ে রয়েছেন। ৩ লাখ ৭ হাজারের বেশি ভোটারের এই আসনে বিএনপি ঐক্য ফেরাতে ব্যর্থ হলে জামায়াতের হাসিই ফোটার সম্ভাবনা বেশি।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা–চৌগাছা): ‘সহানুভূতির মনোনয়ন’ বিতর্ক এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানাকে ঘিরে ‘সহানুভূতির মনোনয়ন’ বিতর্ক তুঙ্গে। তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন জামায়াত প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ। লন্ডনপ্রবাসী হলেও মাঠে তার সক্রিয় উপস্থিতি ভোটারদের নজর কেড়েছে। প্রায় ৪ লাখ ৭৯ হাজার ভোটারের এই আসনে জামায়াতকে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে দেখা হচ্ছে।
যশোর-৩: এখনো বিএনপির শক্ত ঘাঁটি জেলার সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। দলীয় ঐক্য, সংগঠনিক দক্ষতা ও তরুণ ভোটারদের সমর্থনে তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
৬ লাখ ৪১ হাজার ভোটারের এই আসনে জামায়াত প্রার্থী সাবেক ভিপি আবদুল কাদের নতুন মুখ হলেও দলীয় সমর্থন রয়েছে। তবু সামগ্রিক বিচারে যশোর-৩ এখনো বিএনপির দুর্গ হিসেবেই বিবেচিত।
যশোর-৪ (অভয়নগর): সমানে সমান লড়াই
অভয়নগরভিত্তিক যশোর-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার টি. এস. আইয়ুবকে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিও উঠেছে।
এদিকে জামায়াতের জেলা আমীর অধ্যাপক গোলাম রসুল তৃণমূলের সঙ্গে মিশে সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়ে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। ৫ লাখ ২০ হাজারের বেশি ভোটারের এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
যশোর-৫ (মণিরামপুর): প্রার্থী বদলে অস্বস্তি
এই আসনে বিএনপি প্রার্থী পরিবর্তন করে অ্যাডভোকেট শহীদ মোহাম্মদ ইকবালের পরিবর্তে মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাসকে মনোনয়ন দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এর সুযোগে জামায়াত প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী এনামুল হক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় ভোটব্যাংক থাকা সত্ত্বেও তার গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৪ লাখ ১১ হাজার ভোটারের এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর): শেষ মুহূর্তের নাটক
কেশবপুরে বিএনপির প্রার্থী কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে ঘিরে বিতর্ক চরমে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তে আবুল হোসেন আজাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মোক্তার আলী অমায়িক ব্যবহার, শিক্ষানুরাগী ও হিতৈষী ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত। ২ লাখ ২৬ হাজার ভোটারের এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম রাকিব জানিয়েছেন, যশোর জেলার ৮ উপজেলায় ৮২৪টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় প্রশাসনিক প্রস্তুতিও জোরদার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে যশোরের ছয়টি আসনে এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় শক্তির লড়াই নয়; এটি প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক ঐক্য ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা। বিএনপির কোন্দল আর জামায়াতের সংগঠিত প্রস্তুতির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার হাসি ফুটবে,তার উত্তর মিলবে ভোটের দিন।






























