রংপুরের পীরগঞ্জে আলু চাষীদের মাথায় হাত, আলুতে লোকসান

রংপুরের পীরগঞ্জে গত মৌসুমের তুলনায় আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দাম কম হওয়ায় আলু চাষীদের মাথায় হাত পড়েছে। উৎপাদন খরচ ও সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ায় আলু চাষীদের অবস্থা যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাড়িয়েছে। আক্ষেপে অনেক আলু চাষী জমি থেকে আলুই তুলছেন না।
যারা নিরুপায় হয়ে তুলেছেন তারা প্রতি কেজি আলু সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করছেন, যা তাঁদের উৎপাদন খরচের তুলনায় কম। এতে কেজিপ্রতি আলুতে ৮ থেকে ১০ টাকা লোকসান হচ্ছে মর্মে জানিয়েছেন আলু চাষীরা।
এখন আলু উত্তোলন পুরোদমে শুরু হয়েছে। এ বছর আলু উৎপাদনে খরচ অনেকটাই বেড়েছে। বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রতি হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। গত বছর সরকারি বীজের কেজি ছিল ২৮/৩০ টাকা, যা এ বছর বেড়ে ৫০/৬০ টাকা হয়।
বেসরকারি বীজের দামও কেজি প্রতি ৪০ থেকে বেড়ে ৭০/৮০ টাকায় পৌঁছে। এতে মাঠপর্যায়ে আলুর উৎপাদন খরচ পড়ছে কেজিপ্রতি ১৮/২০ টাকা, কিন্তু বর্তমানে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১০-১২ টাকা দরে। ফলে মৌসুমের শুরুতে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন আলু চাষীরা।
চৈত্রকোল ইউনিয়নের হাজিপুর গ্রামের আলু চাষী ফুলবাবু মিয়া জানান, ধার-দেনা করে এবং সার-কীটনাকের দোকানে বাকী রেখে আড়াই বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি। আলুর বাম্পার ফলনও হয়েছে কিন্তু বাজারে দাম নেই বললেই চলে। তিনি দীর্ঘশ্বাসে বলেন, লাভের আশায় সব শেষ। কিভাবে দেনা আর সার-কীটনাকের দোকানের বাকী মিটাবো!
টুকুরিয়া ইউনিয়নের মোনাইল গ্রামের রাজু মিয়ার নিজস্ব আবাদী জমি না থাকায় দেড় বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে আলু চাষ করেন। আলুর বাজার ধ্বসের কারণে জমি থেকে আলুই তোলেননি। তিনি বলেন, এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ ১৮/২০ টাকা, স্টোর ভাড়া, লেবার খরচ, পরিবহন খরচ দিয়ে কৃষকের পকেটে টাকা ঢুকা দুরের কথা, ঘর থেকে আরো টাকা দিতে হচ্ছে। অবস্থাটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে ‘ভিক্ষা চাইনা মা- কুকুর তাড়া’।
রায়পুর ইউনিয়নের মহদিপুর গ্রামের আলুচাষী মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমান আলু কেনার ক্রেতাই নেই। আমরা কৃষকরা বরাবরই ‘বলির পাঁঠা’। সরকারীভাবে আলুর বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আলু আমদানি বন্ধ না করলে আলু চাষীরা পুঁজি অভাবে পরবর্তীতে আলু চাষই করতে পারবে না।
এদিকে পীরগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকায় আলু সংরক্ষনের হিমাগারগুলোতে এখনও আলু সংগ্রহ পুরাপুরি শুরু হয়নি। হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানান, ২/৩ দিনের মধ্যেই আলু সংরক্ষণ শুরু হবে। তাই বস্তাপ্রতি ৫০/ ১’শ টাকা অগ্রিম বুকিং নেওয়া হচ্ছে। পরে হিমাগারে এই টাকা সংরক্ষণের ভাড়া থেকে সমন্বয় করা হবে।
পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, এবারে ৬ হাজার, ৮’শ ৩০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ৫’শ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী আলু উৎপাদন হয়েছে। আলু চাষীদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠার উপায় প্রসঙ্গে কৃষি কর্মকর্তা সুমন আহম্মেদ বলেন, মূলত আমরা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, বিপননের সঙ্গে না।
কৃষি বিপনন বিভাগ এ ব্যাপারে কাজ করছে। তবে আমরা সার, কীটনাশক, উচ্চ ফলনশীল বীজ দিয়ে পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। তিনি আরো বলেন, আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে বায়ারদের মাধ্যমে আলু রফতানির জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

























