রংপুরের পীরগঞ্জে দেশের প্রথম লৌহখনির অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে

দীর্ঘ ৬ দশক পর দেশের প্রথম লৌহখনির কূপ খননের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম বেশ জোরেশোরেই এগিয়ে চলছে। দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন সময়ে লৌহখনির কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

অবশেষে গত ৩১ জানুয়ারী (শনিবার) আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১২’শ মিটার খননেই মিলতে পারে লোহা, তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ ও সোনা। খনিটি উত্তরাঞ্চল তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জিএসবি তথ্য মতে, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ও মিঠিপুর ইউনিয়নের মাঝামাঝি বিশাল একটি এলাকার নাম ভেলামারি পাথার। এ পাথারেই প্রথম অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্বমানের লৌহখনিটির। ১৯৬৪ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধের পর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তৎকালীন পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগের একদল বিশেষজ্ঞ গাড়িবহর নিয়ে এই ভেলামারি পাথারে আসে।

প্রায় ছয় বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই পাথারে তারা লৌহখনির অবস্থান নিশ্চিত করতে বিমানের নিচে একটি বিশাল শক্তিশালী চুম্বক ঝুলিয়ে দেন। এরপর বিমানটি ট্রি লেবেলে পাথারের ওপর দিয়ে উড়তে থাকে। একপর্যায়ে বিমানের ঝুলন্ত চুম্বকটি ছোট পাহাড়পুর গ্রামের আবুল ফজল ও আব্দুল ছাত্তার নামে দুই ব্যক্তির মালিকানাধীন জমির ওপর এসে আকর্ষিত হয়।

এই আকর্ষণ বিমানটিকে বারবার মাটির দিকে টেনে নিচে নামাতে চেষ্টা করে।পরে অন্যান্য পরীক্ষার পর পাকিস্তানের খনিজ বিজ্ঞানীরা এখানে লোহার খনির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হন। পরে উৎস হিসেবে ওই জমির ওপর কংক্রিটের ঢালাই করা চিহ্ন দিয়ে চলে যান।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগ চিহ্নিত স্থানে খনন কাজ শুরু করেন। প্রায় আট মাস ধরে তারা ভেলামারী এলাকার পাশের কেশবপুর, ছোট পাহাড়পুর, প্রথমডাঙ্গা, পবনপাড়া, সদরা কুতুবপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য স্থানে পাইপ বসিয়ে লোহার খনির সন্ধান নিশ্চিত করেন। অনুসন্ধানের সময় পাইপের ভেতর দিয়ে মাটির গভীরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বোমার বিস্ফোরণে ওই এলাকার অনেক মাটির কুয়া ভেঙে যায়। পরে আবারো দ্বিতীয় দফায় পাইপের মাধ্যমে জরিপ কাজ সম্পন্ন করা হয়।

১৯৬৭ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাসহ একদল বিদেশী খনিজ বিশেষজ্ঞ রংপুরে আসেন। তারা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির বিশাল বহর ও পরিবার পরিজনসহ স্থানীয় পানবাজার হাইস্কুল মাঠে অস্থায়ীভাবে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে প্রাপ্ত লোহার উপাদান উত্তোলন করেন। মাটির ৯’শ ফুট নিচ থেকে ২২ হাজার ফুট পর্যন্ত পাইপ খনন করে তারা লোহার উন্নতমানের স্তরের সন্ধান মেলে।

এর বিস্তৃতি প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার। টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাপক অনুসন্ধান শেষে ভেলামারিতে স্থাপনকৃত চারটি মূল পাইপের উৎসমুখে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে বন্ধ করে খনি কর্মকর্তারা তাদের ক্যাম্প গুটিয়ে চলে যান।

বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর দ্বিতীয়বারের মতো ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভেলামারি পাথারে লোহার খনির অনুসন্ধান কাজ শুরু করেন। কিন্তু তারা পূর্বে আবিষ্কৃৃত লৌহ খনির উৎসমুখ ভেলামারি হতে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বড় পাহাড়পুর গ্রামের পূর্বপ্রান্তে পরীক্ষামূলক খনন করে কোনো রিপোর্ট না দিয়েই চলে যান।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে মিঠিপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে নতুন কূপ খননের মাধ্যমে আবারো অনুসন্ধান শুরু করলে যেখানে বেশকিছু খনিজ উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়। অবশেষে দীর্ঘ ৬০ বছর পর ‘ভূতাত্ত্বিক খনন কূপ জিডিএইচ- ৭৯/২৫’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রমের উদ্বোধন করার পর বেশ জোরেশোরেই কাজ এগিয়ে চলছে।

এদিকে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। লৌহখনিটি চালু হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র বদলে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে জিএসবি খনি ব্যবস্থাপক আলী আকবর রোববার জানান, খনির অনুসন্ধান কাজ নিরলসভাবেই চলছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার মিটার খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই আমরা আপনাদের ভাল সংবাদ দিতে পারবো।