বেনাপোল বন্দরে বৈধ পথে চোরাচালান, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পথে চোরাচালান তুলনামূলকভাবে কমে এলেও দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে বৈধ আমদানির আড়ালে ঘোষণাবহির্ভূত ও নো-এন্ট্রি পণ্যের চোরাচালান থেমে নেই। এভাবে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের।

ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাঁচামালসহ নানা ধরনের পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু আমদানিকারক তাদের নিয়োগকৃত সিএন্ডএফ এজেন্টদের মাধ্যমে সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করে বৈধ পণ্যের আড়ালে বিপুল পরিমাণ ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য এবং কখনো কখনো পুরো নো-এন্ট্রি ট্রাক দেশে প্রবেশ করাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে এভাবে আমদানি পণ্যের সঙ্গে চোরাচালানি পণ্য এনে অনেক সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশের সময় প্রবেশদ্বারে দায়িত্ব পালন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কাস্টমস, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে আনসার সদস্য ও বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা আল-আরাফা কোম্পানির কর্মীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রশ্ন এত স্তরের ‘নিছক’ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়েও কীভাবে এসব অবৈধ পণ্য দেশে ঢুকছে? এতে কি অসাধু আমদানিকারক, রফতানিকারক ও তাদের সঙ্গে জড়িত সিএন্ডএফ এজেন্টদের পাশাপাশি প্রশাসনের একটি অংশের যোগসাজশ রয়েছে?

সম্প্রতি ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারত থেকে অবৈধ শাড়ি, থ্রি-পিস, কসমেটিকসসহ নানা ধরনের পণ্যবোঝাই একটি ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ গেটে কাগজপত্র দেখে ওই ট্রাকের এন্ট্রি ও ওজন নেওয়া হলেও কীভাবে ওই গাড়িটি নো-এন্ট্রির পণ্যসহ প্রবেশ করল সে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

এর আগেও বন্দর এলাকা থেকে কাগজপত্রবিহীন প্রায় আড়াই কোটি টাকার পণ্য বের হওয়ার সময় বিজিবি সেগুলো আটক করে। বিভিন্ন সময়ে আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে ফেনসিডিল, মদ ও অন্যান্য ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য উদ্ধারের ঘটনাও রয়েছে।

যদিও মাঝে মধ্যে দু-একটি ট্রাক আটক হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি এর বড় একটি অংশ সরকারি শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘ্নে দেশের অভ্যন্তরে চলে যাচ্ছে। বন্দর এলাকার ৩১ নম্বর ইয়ার্ডে আগে আমদানিকৃত ফলের চালানের মধ্যে ক্যাপসিগাম দেখানো হলেও ট্রাক থেকে পাওয়া গেছে ফেনসিডিল, শাড়ি ও থ্রি-পিস। এছাড়া ওজনে কারচুপি করে পণ্য খালাসের অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষ সূত্র জানায়, অধিকাংশ সময় ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য এনে দ্রুত খালাস করে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র ব্যবহার কিংবা এসএস কোড পরিবর্তন করে পণ্য ছাড় করানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজে কাস্টমস ও বন্দর সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত। সম্প্রতি ৪২ নম্বর শেড থেকে গার্মেন্টস পণ্যের আড়ালে কোটি টাকার ব্লেড উদ্ধার হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে খালাস করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালেদ আবু মোহাম্মাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দ্রুত কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে চোরাচালান বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে, আর এর মাশুল গুনতে থাকবে রাষ্ট্রের রাজস্ব খাত।