তিন পার্বত্য জেলার ষড়যন্ত্রে ১৪ই জুন’ এক কলঙ্কিত দিন

খাগড়াছড়ি রাংগামাটি বান্দরবান পার্বত্য জেলার ষড়যন্ত্রে ১৪ই জুন’ এক কলঙ্কিত দিন, তৎকালীন শান্তিবাহিনী নামে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামে অভ্যন্তরিন ভ্রাতৃঘাতি সশস্ত্র সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। ‘১৪ই জুন’ পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক কলঙ্কিত দিন!

১৯৮৩সালের এ দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির লারমা গ্রæুপ(লাম্বা) প্রীতি গ্রæুপ(বাদি)-এর বিশেষ সেক্টর সদর দপ্তরে হামলা করে। এ হামলায় প্রীতি গ্রæুপের ‘বলী ওস্তাদ’ নামে খ্যাত অবিভক্ত সু-সংগঠক শান্তিবাহিনীর অভিজ্ঞ সামরিক প্রশিক্ষক অমৃত লাল চাকমা, রাজনৈতিক সচিব শরজিৎ চাকমা আর এক সৈনিক প্রাণ হারান।

এর মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সূত্রপাত ঘটে এক রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতি সশস্ত্র সংঘাতের। যার পরিণতি ১৯৮৩সালের ১০ই নভেম্বর প্রীতি গ্রæুপের পাল্টা হামলায় জনসংহতি সমিতির সদর দপ্তর আক্রান্ত হয় এবং এতে খোদ দলটির প্রধান মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা এমপিসহ ৮জন নেতা-কর্মী প্রাণ হারান।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, লাম্বা গ্রæুপ কর্তৃক বলি ওস্তাদকে হত্যার পরেই বাদি গ্রæুপ এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে ওঠে এবং এ ঘটনার ৫মাসের মাথায় কমান্ডো টিম গিযে লাম্বা গ্রæুপের সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে এমএন লারমা এমাপিকে হত্যা করে।

এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, লারমা গ্রæুপ(লাম্বা) যদি বিশেষ সেক্টরে আক্রমণ না করতো তাহলে বাদি গ্রæুপ প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া হতো না, আর এমএন লারমারও প্রাণ হারাতে হতো না। বলি ওস্তাদের খুন পাল্টা খুনেরই জন্ম দিয়েছে।

প্রথম ক্ষমাতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়াবাদী দল(বিএনপি) তৎকালীন মন্ত্রী কর্নেল অলি আহম্মেদ নেত্বতাধীন ৫/৫বার মতো শান্তির আলোচনা বসা হলেও কোন সিদ্ধান্ত পৌছাতে পারেনি।

এরশাদ সরাকারের প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা কাঠামো ১৯৮৯সালে স্থানীয় সরকার পরিষদ উপ-মন্ত্রী পদমর্যদা চেয়ারম্যানসহ ৩০সদস্যের পাহাড়ি-বাংগালীর সকল সম্প্রদায়ের রুুপরেখা প্রত্যক্ষ নির্বাচনে গঠিত হয়।

তৎকালীন সামরিক সরকারের আহবানে শান্তিাবাহিনী কিছু সদস্য পালিয়ে এসে অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলে তাদের পুর্নবাসন উদ্ধ্যোগ গ্রহন করে।
পরবর্তী বাংলাদেশ আওয়ামীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ নেত্রীত্ েগঠিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির সফল আলোচনায় সম্পাদিত ২রা ডিসেম্ব্র ঐতিহাসিক খাগড়াছড়ি ষ্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পনের মাধ্যমে শান্তিবাহিনী পরিসমাপ্তি ঘটে।

এসময় স্বরুপ ষ্টেডিয়ামের ভিতর থেকে দর্শক শারি হতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) আত্মপ্রকাশ ঘটে শান্তিচুক্তির বিরোধীতা করে। এরপর পার্বত্য আজ্ঞলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুন: গঠনে সরকারের হস্তান্তরিত বিভাগ কিছু হস্তান্তর করা হলেও আজবধি বাস্তব কার্যকর নেই বললেই চলে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য হচ্ছে, আজ অবধি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত জারি রয়েছে। এতে কুসুমপ্রিয়-প্রদীপ লাল, রূপক চাকমা, দেবোত্তম চাকমা, মংশে মারমা, অনিমেষ চাকমা, মিঠুন চাকমা, জীবন ত্রিপুরা, তপন চাকমা, বিপুল চাকমা, সুনীল ত্রিপুরা, মিটন চাকমাসহ অসংখ্য সম্ভাবনাময় নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

এ প্রাণহানির ঘটনা এখনো অব্যাহত রয়েছে!
পার্বত্য চট্টগ্রামে লাম্বা-বাদি গ্রæুপ সৃষ্টির মূল কারণ চিহ্নিত করে আজ অবধি শিক্ষামূলক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়নি। জনসংহতি সমিতি উক্ত ঘটনা পর্যালোচনা করে শিক্ষা গ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না।

সে কারণে ‘পার্বত্য চুক্তি’ ও আত্মসমর্পণের পর জনসংহতিতে আবারও ভাঙ্গন ধরে। জনসংহতি সমিতি ‘সন্তু গ্রæুপ’ ও ‘লারমা/সংস্কার গ্রæুপ’ নামে দু’টি দলে বিভক্ত হয়। আবারও উভয় দলের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বেঁধে যায়। বার বার একই গর্তে পা দিয়ে জনসংহতি সমিতি সংগঠন হিসেবে বিধ্বস্ত ও দুর্বল হচ্ছে এবং গোটা জাতির ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে!

রাজনৈতিক মতপার্থক্য রাজনৈতিকভাবে নিরসন না করে, খুনের মাধ্যমে নিজ গোষ্ঠীগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ধ্বংসাত্মক নীতির কারণে জনসংহতি সমিতিতে এভাবে বারে বারে ভাঙ্গন দেখা দেয়, পুনরাবৃত্তি ঘটে রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের, তাতে লাভবান হয় কেবল শাসকগোষ্ঠীই।

এ আত্মঘাতি ভ্রান্ত খুনের রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে বেরুতে না পারলে জনসংহতি সমিতি ‘পার্বত্য চুক্তি’ বাস্তবায়ন দূরের কথা, জাতীয় স্বার্থে কোন ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে না। সংগঠন হিসেবে জনসংহতি সমিতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাও দায় হবে।

উল্লেখ্য তৎকালীন সু-সংগঠিত সশ্রস্ত্র শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির লারমা গ্রæুপ(লাম্বা) সরকারের সেনাবাহিনীর সাথে দেরিতে যুদ্ধ লিপ্ত হওয়া। কিন্ত প্রীতি গ্রæুপ(বাদি) খুব দ্রæত যুদ্ধ অর্জন চাই এবং স্বাধীন স্বায়ত্ব শাসন কায়েম করতে মতপার্থক্য হওয়ার ফলে উভয় গ্রæুপে এ পরিনতি ঘটে।

দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ১৪ই জুন’ এক কলঙ্কিত দিনে তৎকালীন শান্তিবাহিনী নামে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামে অভ্যন্তরিন ভ্রাতৃঘাতি সশস্ত্র সংঘাতের সূচনা হয়ে সাবেক এমপি এমএন লারমাসহ অনেকে হতাহত হয়ে প্রান হারায়।