উন্নয়নের ধুলায় দমবন্ধ খুলনা, বাড়ছে নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি

উন্নয়নের নামে চলমান লাগাতার খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেনেজ সংস্কার ও সড়ক নির্মাণকাজ—সব মিলিয়ে খুলনা মহানগরী এখন ধুলাবালির নগরীতে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং নিয়মনীতি উপেক্ষা করে চলা ব্যক্তিগত নির্মাণকাজ। ফলে প্রতিদিনই খুলনার বাতাস হয়ে উঠছে আরও দূষিত, আরও বিপজ্জনক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে খুলনায় প্রতিদিনই বায়ুমান ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে। এতে নগরবাসীর জন্য তৈরি হয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অথচ এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।
মহানগরীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই বাতাসে উড়ছে ধুলাবালি। কোথাও সড়ক খোঁড়া, কোথাও ফেলে রাখা ইট-বালু, আবার কোথাও মাসের পর মাস সংস্কারহীন ভাঙাচোরা রাস্তা। উন্নয়নকাজ চললেও পরিবেশগত নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা কিংবা কাজ শেষে দ্রুত সড়ক মেরামতের মতো নিয়মগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও সড়ক বিভাগের একসঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন নির্মাণেও পরিবেশ আইন মানার প্রবণতা কম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কের পাশে ইট-বালু রেখে ব্যবসা, অবৈধ ইটভাটা এবং শিল্পকারখানার ধোঁয়া—সব মিলিয়ে নগরীর বাতাসে ধূলিকণার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
সোনাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ধুলার কারণে ঘরবাড়ি সারাক্ষণ নোংরা থাকে। জানালা খুলে রাখা যায় না। বাচ্চাদের সর্দি-কাশি আর শ্বাসকষ্ট আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
কবরখানার মোড় এলাকার ব্যবসায়ী মনির হোসেনের অভিযোগ, সারাদিন দোকানে বসে ধুলা খেতে হয়। চোখ জ্বালা করে, মাথাব্যথা লেগেই থাকে। এভাবে কাজ করাই কষ্টকর।
বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১৫১ থেকে ২০০ মাইক্রোগ্রাম ধূলিকণা থাকলে তা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর, ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারি মাসজুড়ে খুলনার বাতাসে ধূলিকণার মাত্রা প্রায় প্রতিদিনই এই সীমার মধ্যে ছিল। একাধিক দিনে তা ২০০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, উন্নয়নকাজে সমন্বয়ের অভাব, নিয়মিত তদারকির দুর্বলতা এবং দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়াই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় উন্নয়নকাজই এখন দূষণের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পনা ছাড়া একসঙ্গে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলেই নগরবাসী এই ভোগান্তিতে পড়েছে।
নিয়ম না মানার বিষয়টি স্বীকার করে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান বলেন, একাধিক সংস্থা একসঙ্গে কাজ করায় অনেক সময় পরিবেশগত নির্দেশনা পুরোপুরি মানা সম্ভব হয় না। তবে ভবিষ্যতে ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা ও দ্রুত সড়ক সংস্কারের বিষয়ে ঠিকাদারদের আরও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম বলেন, নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত না মানলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
অভ্যন্তরীণ দূষণের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় দূষিত বাতাসও খুলনার বায়ুমানকে প্রভাবিত করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক জিয়াউল হক জানান, জাইকার গবেষণা অনুযায়ী, সীমান্ত পেরিয়ে আসা দূষিত বায়ু খুলনার মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের সংক্রমণ, হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের সহকারী সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান বলেন, শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার, ধুলাবালিযুক্ত এলাকা এড়িয়ে চলা এবং সামান্য অসুস্থতাতেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
খুলনায় বায়ুদূষণ এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়—এটি নগর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সমন্বয়হীন উন্নয়নকাজ, দুর্বল নজরদারি ও আইনের শিথিল প্রয়োগ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই নিয়ম মানা নিশ্চিত করা, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর সমন্বয় না হলে খুলনার বাতাস আরও বিষাক্ত হয়ে উঠবে যার মূল্য দিতে হবে নগরবাসীকেই।





























