মাটির টান নাকি পেটের টান? প্রতি বছর ১০ লাখ মানুষ কৃষি ছাড়ছে যে অদৃশ্য অভিমানে

ভোরের প্রথম আলো ফোটার ঠিক আগের মুহূর্তটা কেমন হয় জানেন? চারপাশ তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন, কিন্তু গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে কুয়াশা ভেদ করে এগিয়ে চলে কাস্তে হাতে একজোড়া ক্লান্ত পা। যে মানুষটার সারা জীবনের পুঁজি ছিল ওই কটা বিঘে জমি আর এক বুক বুকভরা আশা, আজ সেই মানুষটারই চোখের সামনে তার হাতের লাঙলটা কেমন যেন অচেনা ঠেকছে।

পলিমাটির এই সুজাসুজা বাংলায় আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা জমছে। যে মাটি একসময় হাসিমুখে সোনা ফলাত, আজ সেই মাটিকেই চিরকালের মতো বিদায় জানাচ্ছে প্রতি বছর প্রায় দশ লাখ মানুষ। প্রশ্ন জাগে, মাটির সাথে মানুষের যে নাড়ির টান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে ছিল, কর্পোরেট যুগের এসে তাতে কেন এমন মরচে ধরল?

ফসলের মাঠ থেকে ঋণের বোঝা: এক নিষ্ঠুর অঙ্ক
মফস্বল বা গ্রামের হাটবারে গেলে যে বেদনাদায়ক দৃশ্যটা চোখে পড়ে, তা হলো যে কৃষক রক্তজল করা পরিশ্রমে ফলান সোনালী ধান বা তাজা শাকসবজি, ফসল কাটার মৌসুমে তিনিই সবচেয়ে বেশি অসহায়। বাজারে সার, বীজ, ডিজেল আর সেচের দামটা যেভাবে দিনকে দিন আকাশ ছুঁয়েছে, ফসলের দাম কিন্তু সেভাবে এক পা-ও এগোয়নি।

হাটে ফসল বিক্রি করতে গিয়ে দেখা যায়, উৎপাদন খরচই উঠছে না। ফলস্বরূপ, লাভ তো দূরের কথা, মহাজনের ঋণ মাথায় নিয়ে রাতের পর রাত বিনিদ্র কাটানোই যেন কৃষকের একমাত্র নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। পেটে যখন ভাত জোটে না, তখন আর যাই হোক, মাটির টানে বুক বেঁধে পড়ে থাকা যায় না।

কংক্রিটের নির্মম গ্রাস: চোখের পলকে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চিরচেনা সবুজ খেতগুলো। বাড়িঘর, ইটভাটা, রাস্তাঘাট আর অপরিকল্পিত নগরায়নের করাল গ্রাসে গিলে খাচ্ছে উর্বর কৃষিজমি। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ছোট্ট জমিটুকুও ভাইয়ে ভাইয়ে ভাগ হতে হতে আজ এতটাই টুকরো হয়ে গেছে যে, সেখানে ঠিকমতো চাষবাস তো দূরের কথা, চারটা মানুষের দুবেলা ডাল-ভাত জোগাড় হওয়াই দায়।

জমি ফুরিয়ে যাওয়ার এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় ভূমিহীন মানুষগুলোর সামনে তখন খোলা আকাশ আর অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

যন্ত্রের জয়রথ আর খেতমজুরের নিঃসঙ্গ কান্না : কৃষির যান্ত্রিকীকরণ হয়তো আধুনিক যুগের অনিবার্য দাবি, কিন্তু এর উল্টো পিঠের দৃশ্যটা বড় বেশি নির্মম। কম সময়ে বেশি ফসল তোলার জন্য কম্বাইন হারভেস্টার বা ট্রাক্টরের ব্যবহার বাড়লেও, গ্রামীণ খেতমজুর আর দিনমজুরদের মুখের ভাত যেন কেড়ে নিচ্ছে এই লোহালক্কড়গুলো।

যে কাজটাতে একসময় দশ-বারো জন মানুষ একসঙ্গে কাজ করে কিছু রুটি-রুজির সংস্থান করতেন, এখন একটা যন্ত্র নিমিষেই তা শেষ করে দেয়। কাজ হারিয়ে গ্রামের এই প্রান্তিক মানুষগুলো যখন দেখে পেটের টানে গ্রামে বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র উপায় নেই, তখন তারা সব ফেলে পা বাড়ায় শহরের ইট-পাথরের অন্তহীন জঞ্জালের দিকে।

প্রকৃতির সাথে এক অসম লড়া: প্রকৃতির মেজাজ আজ আর আগের মতো নেই। খরা, অতিবৃষ্টি, প্রলয়ঙ্করী বন্যা, নদীভাঙন কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের নোনা জল—সব মিলিয়ে কৃষিকাজ আজ এক প্রকার জুয়াখেলায় পরিণত হয়েছে। সারাবছরের জমানো শেষ সম্বল দিয়ে ফসল ফলিয়েও একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝাপটায় যখন সব ভেসে যায়, তখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি আর থাকে না। এই স্থায়ী অনিশ্চয়তা মানুষকে ভিতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।

সামাজিক মর্যাদার অদৃশ্য ক্ষত: আমাদের সমাজে আজও ‘কৃষক’ শব্দটির সাথে এক ধরনের অবহেলা জড়িয়ে আছে। পড়াশোনা শেষ করে তরুণ প্রজন্ম তো বটেই, খোদ কৃষকের নিজের সন্তানরাও আজ আর এই পেশাকে সম্মانهর চোখে দেখতে পারে না।

গ্রামের ধুলোবালি মাখা জীবন ছেড়ে শহরে গিয়ে ছোটখাটো চাকরি করা, কিংবা বিদেশে গিয়ে হাড়ভাঙা কায়িক শ্রম করাকেও তারা কৃষিকাজের চেয়ে অনেক বেশি ‘মর্যাদাপূর্ণ’ বলে মনে করেন। এই মানসিক দূরত্বই মাটি থেকে মানুষকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

শেষ কথা: কৃষি থেকে মানুষের এই গণ-বিচ্ছিন্নতা কেবল গ্রামীণ অর্থনীতিকেই ভেঙে দিচ্ছে না, এটি আমাদের অস্তিত্বের শেকড়কেই নাড়া দিচ্ছে। যে মানুষগুলো আমাদের অন্ন জোগাচ্ছেন, তারাই যদি একদিন হারিয়ে যান তবে একদিন রূপকথার গল্পের মতো ফুরিয়ে যাবে আমাদের এই সবুজ বাংলা।

মাটি ছেড়ে এই যে মানুষগুলো শহরের বস্তিতে হারিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল পেশা বদল নয়; এটি আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এই নীরব শূন্যতার কারণগুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতেই হবে।