কুড়িগ্রামের রাজারহাটে সরকারি ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ: বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে সরকারি খাদ্যগুদামে বোরো ধান সংগ্রহের কৃষক তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, নির্বাচিত তালিকায় ফসলি জমি নেই এমন ব্যক্তি, এবার বোরো চাষ করেননি এমন ব্যক্তি এমনকি অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দার নামও রয়েছে। এতে প্রকৃত কৃষকেরা সরকারি দামে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ ছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে ধান নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি খাদ্যগুদামে মান ও আর্দ্রতা যাচাই না করে সরাসরি রাইসমিলে পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে। এমনকি এভাবে ধান পাঠানোর সময় কৃষকের কাছ থেকে তিন বস্তা ধান কেটে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন দুই কৃষক।

রাজারহাট উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন থেকে চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি দামে ধান বিক্রির জন্য ২ হাজার ১৬৮ জন কৃষক অনলাইনে আবেদন করেন। পরে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে তাঁদের মধ্য থেকে ৪১৭ জন কৃষককে নির্বাচিত করা হয়। একজন কৃষক সর্বোচ্চ তিন মেট্রিক টন ধান সরকারি খাদ্যগুদামে দিতে পারেন।

রাজারহাট উপজেলায় এ মৌসুমে ১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতি মেট্রিক টন ধানের সরকারি মূল্য ৩৬ হাজার টাকা।

তালিকায় অকৃষক, প্রশ্ন প্রকৃত কৃষকদের
রাজারহাটের কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হলেও লটারির আগে কৃষকের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হয়নি। ফলে ফসলি জমি নেই বা এবার বোরো আবাদ করেননি, এমন ব্যক্তির নামও তালিকায় এসেছে।

কৃষকদের আরও অভিযোগ, একই ব্যক্তির নাম একাধিক ইউনিয়নের তালিকায় রয়েছে। আবার এক ইউনিয়নের বাসিন্দার নাম অন্য ইউনিয়নের কৃষক তালিকাতেও রয়েছে।

উমর মজিদ ইউনিয়নের কৃষক হামিজ মিয়া বলেন, ‘হামরা দিনরাত কষ্ট করি ধান আবাদ করি, আর গুদামোত ধান দিবার পাই না। যারা জীবনে মাঠোত নামে নাই, তাঁরে নাম উঠছে। এরই নাম ডিজিটাল লটারী।’

কৃষকদের প্রশ্ন, লটারি যদি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে হয়ে থাকে, তাহলে লটারিতে নির্বাচিত তালিকায় অকৃষক বা বোরো চাষ করেননি এমন ব্যক্তির নাম এল কীভাবে?

সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী ধানের মান ও আর্দ্রতা পরীক্ষা করার কথা। কিন্তু রাজারহাটে গুদামে ধান না নিয়ে সরাসরি রাইসমিলে পাঠানোর অভিযোগ করেছেন দুই কৃষক।মঙ্গলবার তাঁরা এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগে তাঁরা উল্লেখ করেন, গত ১৯ জুন তাঁরা সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দিতে যান। কিন্তু গুদামে ধান গ্রহণ ও আর্দ্রতা যাচাই না করে তাঁদের ধান সরাসরি একটি রাইসমিলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, রাইসমিলে ধান নেওয়ার সময় আর্দ্রতা পরিমাপ করা হয়নি। এর বিনিময়ে তাঁদের কাছ থেকে তিন বস্তা ধান কেটে নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে অভিযোগকারী এক কৃষক বলেন, সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তাঁদের ধান গুদামে না নিয়ে সরাসরি রাইসমিলে পাঠানো হয়েছে। সেখানে ধানের মান বা আর্দ্রতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও তাঁরা দেখতে পাননি। ‘লটারিতে অনিয়ম হয়নি, সমস্যা তালিকায়’

খাদ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষক নির্বাচনে ডিজিটাল লটারি করা হয়েছে। সেখানে ম্যানুয়ালি কোনো কৃষকের নাম যোগ বা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, কৃষকদের নামের তালিকাটি প্রায় পাঁচ বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল। ফলে ওই তালিকা থেকে লটারিতে নির্বাচিত ব্যক্তিদের মধ্যে কিছুটা অমিল হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘কৃষকদের তালিকা নতুন করে হালনাগাদ করা হচ্ছে। আগামী বছর থেকে এ ধরনের সমস্যা থাকবে না বলে আশা করছি।’

তবে কৃষকদের প্রশ্ন, পুরোনো তালিকা ব্যবহার করা হলেও লটারির আগে তালিকাটি যাচাই করা হলো না কেন। কারণ, পুরোনো তালিকায় থাকা কেউ বর্তমানে কৃষিকাজ না করলে তাঁর নাম দিয়ে সরকারি ধান সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রাজারহাট সরকারি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ শেষ হয়েছে এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ অর্জিত হয়েছে।

কৃষক তালিকায় ভূমিহীন, বোরো চাষ না করা ব্যক্তি কিংবা জেলার বাইরের বাসিন্দার নাম থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কথা বলতে চাননি।

ধানের মান ও আর্দ্রতা যাচাই না করে কৃষকদের ধান সরাসরি রাইসমিলে পাঠানোর অভিযোগ সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে গুদাম থেকে বেরিয়ে যান।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ধান সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে উৎপাদনকারী কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কেনা। কিন্তু তালিকা হালনাগাদ না থাকায় এবং কৃষকের প্রকৃত পরিচয় যাচাই না করায় সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।
একজন কৃষক বলেন, ‘আমরা জমি চাষ করি, ধান ফলাই। কিন্তু সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার সুযোগ পাই না। আবার যারা চাষ করেনি, তাদের নাম লটারিতে ওঠে।’

কৃষকদের দাবি, আগামী মৌসুমের আগে ইউনিয়নভিত্তিক কৃষক তালিকা মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে হবে। কার কত জমি আছে, কে বোরো চাষ করেছেন এবং কে প্রকৃত কৃষক, তা যাচাই করে নতুন তালিকা করার পর লটারি করতে হবে।

কুড়িগ্রাম জেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেননি। আপনিই প্রথম বিষয়টি জানালেন। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এই বিষয়ে জানতে উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা তাসনিম বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে তিনি সাংবাদিককে অভিযোগ দেওয়ার কথা বলে ফোন কেটে দেন