হুমকির মুখে কর্মকর্তার অনিয়ম ঢাকতে ইউপি উদ্যোক্তাদের বলির পাঁঠা বানানোর অভিযোগ

ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলবেষ্টিত ইউনিয়ন পরিষদগুলো অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অসাধু কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্য, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দাপটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ ও ইউপি কর্মচারীরা। সম্প্রতি শিমুলিয়া ইউনিয়নের সচিব (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) মাসুদ করিমের দুর্নীতি ও অনিয়মের বলি হতে হয়েছে দুই নিরপরাধ উদ্যোক্তাকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি কাউনদিয়া ইউনিয়ন থেকে শিমুলিয়া ইউনিয়নে যোগদানের পরপরই দুই উদ্যোক্তা শাওন ও সজিবকে মৌখিকভাবে কাজ থেকে অব্যাহতি দেন ইউপি সচিব মাসুদ করিম। পরবর্তীতে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের নির্দোষ প্রমাণ করা হলেও, ওপরমহলের প্রভাব ও হুমকির মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে তাদের চূড়ান্ত বহিষ্কারের রেজুলেশন অনুমোদন করেন শিমুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক প্রশাসক কামরুজ্জামান।
ঘটনার নেপথ্যে সচিবের কারসাজি স্থানীয় সূত্র ও শিমুলিয়া ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির তথ্যমতে, নষ্কর আলী নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে মূল্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট) করানোর নামে সাভারের বিভিন্ন কারখানা থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায় করতেন ইউপি সচিব মাসুদ করিম। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে পরিষদে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং বাধ্য হয়ে নষ্কর আলীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
নিজের অনিয়ম ঢাকতে সচিব মাসুদ করিম তার পরিচিত এক সাংবাদিককে দিয়ে একটি সংবাদ প্রচার করান, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উদ্যোক্তা শাওন, সজিব এবং তৎকালিন প্রশাসক কামরুজ্জামানকে অভিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ইউপির ৩ জন সদস্যের (মেম্বার) সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান চালিয়ে সচিবের এই কারসাজি উন্মোচন করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—উদ্যোক্তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং অনিয়মের মূল হোতা স্বয়ং সচিব মাসুদ করিম। প্রতিবেদনে সচিবের বদলিই শিমুলিয়া ইউনিয়নের সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে সুপারিশ করা হয়।
ধামসোনা ইউনিয়নে যোগদানের পরও ইউপি সচিব মাসুদ করিমের নানামুখী প্রভাব বিস্তার অব্যাহত থাকে। , সচিবের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের কাছে বার্তা পাঠানো হয়।
সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (মি. X) সচিব মাসুদ করিমের আত্মীয়। পরবর্তীতে মাসুদ করিমকে নিয়ে আর কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য সংবাদকর্মীকে নিষেধ করা হয়।
এর আগেই সাভারের ধামসোনা ইউনিয়নে সদ্য যোগ দেওয়া সচিব মাসুদ করিমের একটি বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ধামসোনা ইউনিয়নের উদ্যোক্তা ও হিসাব সহকারীদের হুমকি দিয়ে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, “আমি পারি না এমন কিছু নাই। শিমুলিয়াতে ২ জন উদ্যোক্তাকে সরাইছি, সেখানে এখনো থার্ডপার্টি কাজ করছে। এখানকার উদ্যোক্তা ও হিসাব সহকারীদের সরাইতে মাত্র ৭ দিন সময় লাগবে।”
হুমকির মুখে রেজুলেশনে বাধ্য প্রশাসক তদন্ত প্রতিবেদনে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দুই উদ্যোক্তাকে কেন বহিষ্কার করা হলো—এমন প্রশ্নে শিমুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক প্রশাসক কামরুজ্জামান জানান, “সচিবের অনিয়মে সায় না দেওয়া এবং তাদের বহিষ্কারের রেজুলেশন করতে অস্বীকৃতি জানানোয় আমার বিরুদ্ধেও মিথ্যে সংবাদ প্রচার করানো হয়।
পরবর্তীতে উপরমহল ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে একের পর এক হুমকি আসতে থাকে। বাধ্য হয়ে আমি রেজুলেশনে স্বাক্ষর করে ইউএনও সাহেবের কাছে পাঠাই এবং পুরো বিষয়টি অবহিত করি।”
তিনি আরও বলেন, “একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কতটা প্রভাবশালী হলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কাউনদিয়া, শিমুলিয়া, বনগাঁও ও পরবর্তীতে ধামসোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নে বদলি হতে পারেন! শাওন ও সজিবকে বহিষ্কার করা সচিবের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত ছিল।”
রেজুলেশনে স্বাক্ষরকারী ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান, মমতাজ বেগম, আব্দুল মান্নান, আব্দুল আলিম ও হেলাল উদ্দিন জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের (সচিব ও প্রশাসক) দাপটের কাছে সাধারণ সদস্যদের কিছু করার থাকে না। প্রশাসনিক জটিলতায় সচিব বা প্রশাসক যেখানে স্বাক্ষর করতে বলেন, পদ টিকিয়ে রাখতে তাদের সেখানেই সই দিতে হয়।
ভুক্তভোগী দুই উদ্যোক্তা শাওন ও সজিব আক্ষেপ করে বলেন, “দীর্ঘ এক বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা জানি না আমাদের দোষ কী ছিল। কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়া মৌখিকভাবে বাদ দেওয়ার পর নানা মাধ্যমে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় যেন আমরা প্রশাসকের কাছে স্বইচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দিই।”
ধামসোনা ইউনিয়নের বর্তমান প্রশাসক (উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা) মোহাইমিনুল ইসলামের নিকট এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টি শিমুলিয়া ইউনিয়নের তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। প্রশাসনিক কোনো পদে বিতর্কিত ও বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের যুক্ত থাকার বিষয়টি পরিষদের জন্য অশনিসংকেত। তথ্যটি জানার পর আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করব।”
এ বিষয়ে আওয়ার নিউজ বিডিকে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জানান, “প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন। এটি আগের ঘটনা, তবে বিষয়টি আমি গুরুত্ব সহকারে দেখছি। কোন অভিযোগ পেলে তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অনিয়ম-দুর্নীতিতে যুক্ত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখোমুখি না করে ধামসোনার মতো শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নে পদায়ন করাকে ‘পুরস্কৃত’ করার শামিল বলে মনে করছেন সাভারের সচেতন মহল। অবিলম্বে প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের তদন্ত সাপেক্ষে নিরপেক্ষ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।






























