কাগজে আইন, ভাড়াটিয়া অনাথ, জানুয়ারি মানেই ভাড়া বৃদ্ধির উৎসব

নতুন বছর মানেই নতুন আশা। নতুন স্বপ্ন। কিন্তু রাজধানী ঢাকার লাখো ভাড়াটিয়ার কাছে জানুয়ারি মানেই আতঙ্কের নাম। জানুয়ারি এলে বাড়ির মালিকদের মনে ঈদের খুশি দোল খায়। ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ যেন হয়ে উঠেছে অলিখিত নিয়ম।

লিখিত নেই চুক্তি, নেই আইনের প্রয়োগ, মানবিক বিবেচনা তো নেই,ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে চলেছেন বাড়িওয়ালারা। আয়ের চাকা যেখানে স্থবির, সেখানে ব্যয়ের লাগামহীন উল্লম্ফনে মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের চোখে অন্ধকার, টিকে থাকার আশার আলো ক্ষীণ!

সরেজমিনে দেখা গেছে, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই রাজধানীর কল্যাণপুর,মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলী, উত্তরা, ধানমন্ডি, বনশ্রী, মোহাম্মদপুর, বসিলা,
খিলগাঁও, বাসাবো, তেজগাঁও ও ফার্মগেটসহ অধিকাংশ এলাকায় নতুন ভাড়া কার্যকর হয়েছে। কোথাও ৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে ভাড়া।

পরিসংখ্যান বলছে,গত ২৫ বছরে বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ।১০ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ। কিন্তু একই সময়ে মানুষের গড় আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানী ঢাকা। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, ৩০৬ বর্গ কিলোমিটারের এই শহরের বর্তমান জনসংখ্যা ২ কোটির বেশি। জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাসা ভাড়া।

আয়ের সিংহভাগ গিলে খাচ্ছে বাড়িভাড়া
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও ভাড়াটিয়া পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মোট আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে শুধু বাড়িভাড়া দিতে। আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে আবাসন ব্যয় আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলা হয়, সেখানে ঢাকা এখন দ্বিগুণ চাপের নগরী।

উন্নয়নই যেন বোঝা:
সরকারি অর্থে নির্মিত মেট্রোরেল চালুর পর থেকে মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও পল্লবী এলাকায় বাসা ভাড়া বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। যাতায়াত সুবিধাকে অজুহাত বানিয়ে বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ালেও উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে গিয়ে বাড়তি মূল্য দিচ্ছেন ভাড়াটিয়ারা। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প যেন সাধারণ মানুষের স্বস্তির বদলে নতুন আর্থিক চাপের নাম হয়ে উঠেছে।

মিরপুরের এক পোশাকশ্রমিক আব্দুল মজিদ বলেন,
১৫ হাজার টাকা বেতনে সংসার চালানোই কষ্ট। তার ওপর জানুয়ারি এলেই ভাড়া বাড়ে। না মানলে বাসা ছাড়তে হবে এটাই শেষ কথা বাড়ি ওয়ালার।

আইন আছে, বাস্তবে অনাথ:
বাংলাদেশে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন–১৯৯১ নামে আইন থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আইন অনুযায়ী লিখিত চুক্তি ছাড়া ভাড়া দেওয়া বেআইনি এবং চুক্তির মেয়াদের আগে ভাড়া বাড়ানো নিষিদ্ধ। অথচ রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ বাসাবাড়িতেই ভাড়া দেওয়া হয় মৌখিক চুক্তিতে।আইনজীবীরা বলছেন, সরকারের স্পষ্ট নীতিমালা ও তদারকির অভাবে বাড়িওয়ালারা কার্যত আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করছেন।

বুকিং, অগ্রিম:
বাড়িভাড়া ছাড়াও ভাড়াটিয়াদের গলাকাটা তৈরি করছে অতিরিক্ত অগ্রিম, সার্ভিস চার্জ ও ইউটিলিটি বিল। কিছু এলাকায় ১–২ মাসের অগ্রিম থাকলেও অভিজাত এলাকায় দিতে হচ্ছে ৪ মাস পর্যন্ত অগ্রিম। অনেক ক্ষেত্রে বাসা ছাড়ার সময় সেই টাকা ফেরত পেতেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

শহর ছাড়ছে মধ্যবিত্ত, ভাঙছে স্বপ্ন:
বাড়িভাড়ার চাপে অনেক পরিবার ঢাকার বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কেউ সন্তানদের ভালো স্কুল থেকে তুলে নিচ্ছেন, কেউ চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের বাজেট কমাচ্ছেন। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

মুনছুর আলী নামে এক অভিভাবক বলেন,
“ঢাকায় থেকে সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন ছিল। এখন মনে হচ্ছে, সেই স্বপ্নই আমাদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে।”

ভাড়াটিয়াদের দাবি
# এলাকাভিত্তিক সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ
# বাধ্যতামূলক লিখিত চুক্তি
# ভাড়া সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
# মধ্যবিত্তের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্প সম্প্রসারণ

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “নিরাপদ আবাসন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এলাকাভিত্তিক ভাড়ার সীমা, বাধ্যতামূলক চুক্তি এবং সরকারি তদারকি ছাড়া এই নৈরাজ্য বন্ধ করা যাবে না।”

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই ধারা চলতে থাকলে ঢাকা ধীরে ধীরে শুধু উচ্চবিত্তদের শহরে পরিণত হবে।