খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: সুস্থতার স্বপ্ন আর সংকটের বাস্তবতা

১৯৮৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘খুলনা আড়াইশো বেড হাসপাতাল’ নামে যাত্রা শুরু করা এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি আজ পরিচিত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নামে। সময় বদলেছে, নাম বদলেছে কিন্তু বদলায়নি বাস্তবতা। ২০০৮ সালে হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত হলেও, জনবল কাঠামো সেই আগের জায়গাতেই আটকে আছে। ফলে রোগীর চাপ বাড়লেও সেবার সক্ষমতা বাড়েনি।

বর্তমানে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকছে প্রায় ১,৬০০ থেকে ২,০০০ রোগী, যা ধারণক্ষমতার প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। ফলে হাসপাতালের করিডর, ওয়ার্ড, এমনকি মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা সেবা-যেখানে একদিকে রোগীর আহাজারি, অন্যদিকে ক্লান্ত চিকিৎসক-নার্সদের নিরব সংগ্রাম।

হাসপাতালের তথ্য বলছে- প্রথম শ্রেণির ৩১৫ পদের মধ্যে শূন্য ৪৫টি, প্রথম শ্রেণির নার্সিং কর্মকর্তার গুরুত্বপূর্ণ ২টি পদই শূন্য, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নার্সিং কর্মকর্তার একাধিক পদ শূন্য তাই আউটসোর্সিং কর্মীর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে রোগীদের। তবে আউটসোর্সিং কর্মীদের অনেকে নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না, ফলে সেবার মান আরও ব্যাহত হচ্ছে।

পিরোজপুর থেকে আসা রবিউল ইসলাম চোখে ক্লান্তি আর কণ্ঠে চাপা কষ্ট নিয়ে জানান, আমি আমার আব্বাকে নিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫-৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডে আজ তিন দিন ধরে রয়েছি। ভর্তি হওয়ার পর প্রথমে কোনো বেড পাইনি। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই থাকতে হয়েছে। এই দুই দিন আমাদের জন্য খুবই কষ্টের ছিল। অসুস্থ মানুষকে নিয়ে মেঝেতে থাকা যে কতটা যন্ত্রণার, সেটা ভাষায় বোঝানো যাবে না। চারপাশে শুধু রোগী আর স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস, কেউ বসে আছে, কেউ শুয়ে আছে সবাই যেন এক নিঃশব্দ অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে।
তিনি জানান, দুই দিন পর আজ একটা বেড পেয়েছি, কিন্তু এই সময়টা আমরা যে কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছি, সেটা ভুলার মতো না। শুনেছি এখানে জনবল সংকট আছে, বেডেরও ঘাটতি রয়েছে। হয়তো সেই কারণেই এত চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

রবিউল আরও বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সরা চেষ্টা করছেন, কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে সবাইকে ঠিকভাবে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধু চাই, এই অবস্থা যেন দ্রুত ঠিক হয় কারণ অসুস্থ মানুষ আর অপেক্ষা করতে পারে না।

নড়াইল থেকে চিকিৎসা নিতে এসে আলী আকবার ক্লান্তি আর উদ্বেগে ভরা এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেন, “আমি আমার মেয়েকে নিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চার দিন ধরে এই হাসপাতালের ভিড়ের ভেতরেই আমাদের দিন কাটছে।
তিনি আরও জানান, এখানে রোগীর চাপ এত বেশি যে কোথাও দাঁড়ানোরও জায়গা পাওয়া কঠিন। প্রথম দিন থেকেই বেড পাইনি, বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে। অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে এমন পরিস্থিতি সত্যিই খুব কষ্টের।

চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, একদিকে রোগীর কান্না, অন্যদিকে সীমাহীন চাপ সব মিলিয়ে আমরা ঠিকভাবে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছি। তবুও চেষ্টা করি যেন কোনো রোগী অবহেলার শিকার না হন। প্রতিদিন অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন তারা।

হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় এবং দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের কারণে আমরা চিকিৎসা দিতে চরম চাপের মধ্যে আছি।
তিনি আরও জানান, এই হাসপাতাল এখনো ৫০০ বেডের জন্য নির্ধারিত পুরনো জনবল কাঠামো দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন এর কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছে। ফলে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা সবাই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করছেন।
পরিচালক বলেন, জনবল বাড়ানো গেলে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে রোগীরা যতটা সম্ভব ভালো সেবা পান, কিন্তু বাস্তবতা হলো চাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

সব মিলিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেন আজ আর শুধু একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নয় এটা এক নিঃশব্দ সংগ্রাম। যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে সুস্থতার আশায়। বেডের সংকট, জনবলের ঘাটতি আর রোগীর উপচে পড়া ভিড়ের মাঝেও থেমে নেই চিকিৎসকদের চেষ্টা তবুও প্রশ্নটা থেকেই যায়, এই চাপের ভেতর কতদিন টিকে থাকবে সুস্থতার স্বপ্ন?