খুলনা-১: আওয়ামী লীগবিহীন মাঠে নীরব ভোট, তিন প্রার্থীর ত্রিমুখী সমীকরণ

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা দাকোপ আর খুলনা মহানগরের প্রান্ত ছুঁয়ে থাকা বটিয়াঘাটা—এই দুই উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত খুলনা-১ সংসদীয় আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের ‘নিরাপদ ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদ দিলে প্রতিবারই এখান থেকে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার ছেদ পড়েছে। ক্ষমতাসীন দলটি এই আসনে কোনো প্রার্থী না দেওয়ায় রাজনীতির পুরোনো সমীকরণ ভেঙে নতুন এক বাস্তবতার জন্ম হয়েছে।
এই শূন্যতাকে ‘সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন ১০টি রাজনৈতিক দলের ১২ জন প্রার্থী। কিন্তু মাঠে নেমে ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়—প্রার্থী বেশি হলেও উত্তেজনা নেই, স্লোগান আছে কিন্তু ঢেউ নেই। খুলনা-১ যেন এক নীরব নির্বাচনের পরীক্ষাগার।
খুলনা-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩ জন। এর প্রায় অর্ধেক নারী। দাকোপ উপজেলায় হিন্দু ভোটার প্রায় ৫৪ শতাংশ, আর বটিয়াঘাটায় প্রায় ২৭ শতাংশ। এই ধর্মীয় বিন্যাসই আসনটিকে দীর্ঘদিন ধরে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। সাধারণত আওয়ামী লীগ এই ভোটব্যাংকের বড় অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু দলটি মাঠে না থাকায় ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন।
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোট নিয়ে তেমন আলোচনা নেই চায়ের দোকান, বাজার কিংবা ঘাটে। অনেকেই বলছেন, “দেখি কী হয়।” এই নিরুত্তাপ পরিবেশই হয়ে উঠেছে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর।
এই নীরব মাঠে সবচেয়ে বড় আশার আলো দেখছেন বিএনপির প্রার্থী আমীর এজাজ খান। ২০০১ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে এই আসনে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করছেন। কখনো জেতেননি, কিন্তু প্রতিবারই ভোটের ব্যবধান কমিয়েছেন—এটাই তার রাজনৈতিক পুঁজি।
তার সমর্থকদের ভাষায়, আওয়ামী লীগবিহীন এই মাঠে ২৫ বছর পর ‘ভাগ্য খুলে যেতে পারে’।
দীর্ঘদিন এলাকায় থাকা, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো—এই ব্যক্তিগত উপস্থিতিকেই তারা ভোটে রূপ নিতে দেখছেন।
আমীর এজাজ খান নিজেও আত্মবিশ্বাসী। তার দাবি, মানুষ আমাকে চেনে, জানে। এবার সেই পরিচয় ভোটে রূপ নেবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- নীরব ভোটাররা শেষ মুহূর্তে ভোটকেন্দ্রে যাবেন তো?
খুলনা-১ আসনে সবচেয়ে আলোচিত নাম নিঃসন্দেহে জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী। ১৯৯৬ সালের পর এই আসনে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি। তাও আবার একজন হিন্দু নেতাকে প্রার্থী করা এটি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং কৌশলগত বার্তাও।
ডুমুরিয়ার চুকনগরের এই নেতা অল্প সময়েই দাকোপ-বটিয়াঘাটায় পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তার সাদাসিধে কথা, রসাত্মক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা তরুণদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি জামায়াতের ভেতরেও দ্বিধা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কৃষ্ণ নন্দী নিজেকে দেখছেন ‘ভুল ধারণা ভাঙার প্রতীক’ হিসেবে। তার বক্তব্য, তিনি নির্বাচিত হলে ধর্ম নয়, মানুষই হবে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—এই ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ভোটের বাক্সে কতটা প্রতিফলিত হবে?
আলোচনার তৃতীয় নাম সিপিবির কিশোর কুমার রায়। তিনি নতুন মুখ নন। দাকোপ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থীকে হারিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে।
তার শক্তি হলো স্থানীয় সংগঠন ও মাঠের কর্মীভিত্তি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই শক্তি কতটা বিস্তৃত হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এই তিনজনের বাইরে আরও নয়জন প্রার্থী থাকলেও তাদের নিয়ে আলোচনার মাত্রা কম। অনেক ভোটারের কাছেই তারা ‘নামমাত্র প্রার্থী’। এতে বোঝা যায়, লড়াই মূলত তিনমুখী হলেও ভোট ভাগাভাগির হিসাব শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত ফলও এনে দিতে পারে।
খুলনা-১ আসনের এবারের নির্বাচন শোরগোলের নয়, বরং নীরবতার। এখানে স্লোগানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভোটারের নীরব সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটের চিরচেনা অভ্যাস ভেঙেছে, কিন্তু নতুন অভ্যাস এখনো তৈরি হয়নি।
কে জিতবেন- এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আগেভাগে কারও কাছে নেই। স্থানীয় ভোটারদের ভাষায়, ১২ ফেব্রুয়ারির রাতের আগে কিছু বলা মুশকিল। আর সেটাই খুলনা-১ আসনকে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।






























