নিরাপদ সড়কের আহ্বান: আর কত প্রাণহানি দেখলে আমরা জাগ্রত হবো

বর্তমান বাংলাদেশে সড়ক যেন নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে মৃত্যুর মিছিল। বিশেষ করে ঈদকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়ে গেলে সড়কে দুর্ঘটনার মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গেলো ঈদুল ফিতরের আগে এবং পরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২৫০ জনেরও বেশি প্রাণহানি।

এ সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি আলো নিভে যাওয়ার বেদনাদায়ক গল্প। আমরা সবাই জানি, সড়ক ব্যবস্থার দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। দ্রুতগতির প্রতিযোগিতা, বেপরোয়া স্টিয়ারিং, লাইসেন্সহীন বা অদক্ষ চালকদের দৌরাত্ম্য, যানবাহনের ফিটনেস না থাকা, সড়কের নাজুক অবস্থা- সব মিলিয়ে রাস্তাঘাট হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ।

যারা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ঘর থেকে বের হন, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেন না। এমন নির্মম বাস্তবতা কি আমাদের বিবেককে আর নাড়া দেয় না? নিরাপদ সড়ক আজ আর একটি সাধারণ দাবি নয়; এটি বাঁচার অধিকার, বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব। শিশু, কর্মজীবী, শ্রমজীবী, বৃদ্ধ- সবাই যেন নিশ্চিন্তে পথে চলতে পারে, এটিই একটি সভ্য রাষ্ট্রের মূল চাওয়া।

সড়ককে নিরাপদ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা। আইন আছে, শাস্তির বিধানও আছে- কিন্তু তা কার্যকরভাবে প্রয়োগের অভাবই বড় সমস্যার জায়গা। সড়কে উল্টাপাল্টা গাড়ি চালানো, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরা, লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভিং- এসব কোনোভাবেই বরদাস্তযোগ্য নয়।

যারা সড়ককে অরাজকতায় ভরিয়ে তুলছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স যাচাই ও যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সড়কে নামার আগে একটি গাড়ি কতটা নিরাপদ, চালক কতটা দক্ষ।

এগুলোর কঠোর পরীক্ষা ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন অসম্ভব। পথচারীদের সচেতন আচরণ, ট্রাফিক চিহ্ন মেনে চলা, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার, রাস্তা পারাপারের নিয়ম। সব কিছুর প্রতি জনগণকে আরও সতর্ক হতে হবে।

মনে রাখা জরুরি- নিরাপত্তা কেবল চালকের নয়, পথচারীরও দায়িত্ব। চতুর্থত, সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে হবে। হাইওয়ের সিসিটিভি নজরদারি, কার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সতর্ক ব্যবস্থা, এবং নিয়মিত সড়ক মেরামত- এসবই নিরাপদ সড়কের ভিত্তি হতে পারে।

সবশেষে, আমাদের বুঝতে হবে- প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অসংখ্য জীবনের দীর্ঘশ্বাস। একটি শিশু পিতাকে হারায়, একটি মা সন্তানকে হারায়, একটি পরিবার ভেঙে যায়। এই শোক, এই ক্ষত কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। তাই এখনই সময়- সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমে নয়, কার্যকর উদ্যোগে পরিণত করার।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি যেন শুধু পোস্টার বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা বাস্তবে সবার জন্য নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা হয়ে উঠুক। আমরা চাই এমন একটি দেশ, যেখানে মানুষ ঘর থেকে বের হলে ফিরে আসার নিশ্চয়তা থাকবে। নিরাপদ সড়ক আমাদের অধিকার- আর এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ সকলের যৌথ দায়িত্ব। এখনই জাগার সময়।