যশোরের শার্শার ‘অগ্নিকন্যা’ নার্গিস পারভিন মুক্তি

যশোরের সীমান্তঘেঁষা জনপদ শার্শা রাজনৈতিক আন্দোলন ও তৃণমূল সংগঠনের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। সেই শার্শা থেকেই উঠে আসা লড়াকু নারী নেতৃত্ব নার্গিস পারভিন মুক্তি এখন সংরক্ষিত নারী আসনে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে। তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘অগ্নিকন্যা’ নামে।

১৯৭৮ সালের ১৮ অক্টোবর শার্শা উপজেলার শিয়ালঘোনা গাতীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মরহুম আব্দুস সাত্তার ও মাতা মিসেস জাহানারা বেগম। সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার পরিবেশে বেড়ে ওঠা নার্গিস পারভিন মুক্তি উচ্চশিক্ষা শেষে বি.এস.এস ও এলএল.বি ডিগ্রি অর্জন করে আইন পেশায় যুক্ত হন।

তার স্বামী মরহুম শাহিনুর রহমান স্বপন ১৯৯১ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতির বাস্তবতা ও মানুষের সমস্যা কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক দর্শনকে আরও দৃঢ় করে।

বর্তমানে তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত নং-০৯, ঢাকায় পিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেলের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নির্যাতিতদের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ।

তিনি অঙ্গীকার করে বলেন, আইনের শাসন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিচার যেন দ্রুত, কার্যকর ও ভুক্তভোগী-সহায়ক হয়—এটাই আমার অঙ্গীকার। সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেলে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আরও কার্যকর আইন ও বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কাজ করবো।

ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’র মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়ে একাধিক মামলা, হামলা ও পুলিশি হয়রানির শিকার হলেও সংগঠনের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি। অসুস্থ অবস্থাতেও রাজপথে উপস্থিত থাকার ঘটনাগুলো তাকে তৃণমূলের কাছে আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দলীয় কাঠামোয় তিনি বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ক্রীড়া সম্পাদক, কৃষক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক, ঢাকা আইনজীবী সমিতির লাইব্রেরি সম্পাদক এবং সাবেক নির্বাহী সদস্য (২০১৩–২০১৪) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জিয়া মঞ্চ ঢাকা উত্তর, মহিলা দল যাত্রাবাড়ী থানা ও বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স ফ্রন্টের বিভিন্ন দায়িত্বেও ছিলেন সক্রিয়।

তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির দর্শন তার রাজনৈতিক ভিত্তি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে ভোটাধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রতিও আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।

সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি নির্বাচিত হলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেত্রীদের প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ ও সাংগঠনিক অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

এছাড়া তিনি আরও বলেন, শার্শা সীমান্তবর্তী এলাকা। এখানে অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বেকার যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। আমি চাই শার্শার কণ্ঠস্বর জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে উচ্চারিত হোক। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি সহায়তা সহজপ্রাপ্য করা, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং সংসদে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথের আন্দোলন ও আদালতের অভিজ্ঞতার সমন্বয় তাকে সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। অনেকের ভাষায়, তিনি শুধু একজন প্রার্থী নন—সংগ্রামের প্রতীক।

শার্শার তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, নার্গিস পারভিন মুক্তি সংসদে গেলে তা শুধু একটি সাংবিধানিক পদ পূরণ হবে না; বরং সীমান্ত জনপদের নারীদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠবে।

সংগ্রাম, আইন, আদর্শ ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব এই চার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে শার্শার ‘অগ্নিকন্যা’ নার্গিস পারভিন মুক্তির রাজনৈতিক যাত্রা এখন নতুন এক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে তার নাম ঘিরে আলোচনা যত বাড়ছে, ততই শার্শার মানুষের প্রত্যাশাও হয়ে উঠছে স্পষ্ট তাদের কণ্ঠস্বর কি এবার জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে?