স্থানীয় সরকার নির্বাচন, কাউন্সিল ও সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে বিএনপির জোর

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার, জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন এবং তৃণমূলকে আরও সক্রিয় করার সিদ্ধান্তে গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও বন্যা পরিস্থিতিও আলোচনায় স্থান পায়।
প্রায় দুই মাস পর শনিবার (১১ জুলাই) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই বৈঠক চলে রাত প্রায় ৯টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের পটভূমিতে এটি ছিল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির তৃতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
দলীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বৈঠকে মূলত চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে—আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলের জাতীয় কাউন্সিল, সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসনের উপায়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সতর্ক অবস্থান
বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে থেকে শুরু হতে পারে এবং দল কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে মত দেন। তবে নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোনো সময় চূড়ান্ত হয়নি।
সূত্র জানায়, নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে এবার সতর্ক অবস্থান নিতে চায়। এজন্য বিভিন্ন এলাকায় জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং হবে। তাই এখন থেকেই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
আলোচনার একপর্যায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সাম্প্রতিক এক মন্তব্য—আগামী সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে—প্রসঙ্গটি কয়েকজন সদস্য উত্থাপন করেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের অক্টোবর থেকে নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যও আলোচনায় আসে।
তবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ উপস্থিত সদস্যরা স্পষ্ট করেন, নির্বাচন শুরুর বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
জাতীয় কাউন্সিল ও কমিটি পুনর্গঠনের তাগিদ
বৈঠকে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য দলের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের বিষয়টি উত্থাপন করলে তারেক রহমান জানান, দলের কাউন্সিল অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে।
অধিকাংশ সদস্য চলতি বছরের শেষ নাগাদ কাউন্সিল আয়োজনের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি যেসব জেলা, মহানগর ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো দ্রুত পুনর্গঠনের পক্ষেও মত দেন নেতারা।
তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির আগে সংগঠনকে শক্তিশালী করা জরুরি।
তৃণমূলে জনসমর্থন যাচাইয়ে বড় পরীক্ষার সামনে বিএনপি
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা
বৈঠকে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়েও পর্যালোচনা হয়। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মনে করেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, সারা দেশে খাল খনন ও পুনঃখননসহ বিভিন্ন উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন সদস্যরা। একই সঙ্গে যেসব প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়ন বাকি রয়েছে, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়।
নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসন ও চাকরিতে ‘মেধার মূল্যায়ন’
বৈঠকে বিগত ১৭ বছরে রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিএনপির নেতা-কর্মীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, যাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা রয়েছে, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মতো রাজনৈতিক পরিচয়কে চাকরির একমাত্র ভিত্তি করা হবে না।
সরকারি চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও সক্ষমতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এমন নীতিগত অবস্থানের কথাও বৈঠকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
বন্যা পরিস্থিতিও আলোচনায়
দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি এবং দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
নিয়মিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত
দলীয় সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘ সময় জাতীয় স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক হয়নি। শনিবারের বৈঠকে দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের কার্যক্রম এবং দলের সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। ভবিষ্যতে নিয়মিত বিরতিতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক করার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে।
বৈঠকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস মালয়েশিয়া থেকে বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
এর আগে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ৪ এপ্রিল ও ১৭ মে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গতকাল শনিবারের বৈঠকটি ছিল সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় আনুষ্ঠানিক সভা।






























